দেশের দুই জনপ্রিয় সমুদ্রগন্তব্য কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। সাম্প্রতিক ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতেও প্রত্যাশিত পর্যটক সমাগম হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনোদনের সীমিত সুযোগ, সেবার মানের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পর্যটন খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির তথ্যমতে, শহর ও সৈকত এলাকায় পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউস রয়েছে, যেখানে দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে ঈদুল আজহার দিন থেকে ১০ দিনে প্রায় সাত লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, বর্তমানে শহরের হোটেলগুলোতে দৈনিক মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার পর্যটক অবস্থান করছেন। অধিকাংশ হোটেলের কক্ষ খালি পড়ে আছে। এমনকি কক্ষভাড়ায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ছাড় দিয়েও পর্যাপ্ত অতিথি পাওয়া যাচ্ছে না।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, গত ঈদুল ফিতরের আট দিনের ছুটিতে প্রায় ১২ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটেছিল এবং তখন পর্যটন খাতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল। এবার ১০ দিনে প্রায় সাত লাখ পর্যটকের আগমনে ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হওয়া সত্ত্বেও কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য আধুনিক বিনোদনের সুযোগ সীমিত। সমুদ্রে গোসল, সূর্যাস্ত উপভোগ, মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি, ইনানী সৈকত, মহেশখালী, রামুর বৌদ্ধপল্লি কিংবা নাফ নদী ভ্রমণই এখনো প্রধান আকর্ষণ হয়ে আছে।

কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা মনে করেন, কেবল কার, থিমভিত্তিক বিনোদন কেন্দ্র, লেক শো, পারিবারিক বিনোদন পার্ক এবং রাত্রিকালীন পর্যটন সুবিধা গড়ে তুলতে না পারলে পর্যটকদের দীর্ঘসময় ধরে রাখা কঠিন হবে। একই সঙ্গে পর্যটন পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

অব্যবস্থাপনায় জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে কুয়াকাটা

‘সাগরকন্যা’ নামে পরিচিত কুয়াকাটাতেও পর্যটক কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হোটেল মালিকদের দাবি, কয়েক বছর আগেও ছুটির মৌসুমে অধিকাংশ হোটেল ও রিসোর্টে কক্ষ পাওয়া কঠিন ছিল। বর্তমানে অনেক সময় অর্ধেক কক্ষও ভাড়া হচ্ছে না।

পর্যটকদের অভিযোগ, সৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও খাদ্যপণ্যের মোড়কসহ নানা ধরনের বর্জ্য পড়ে থাকে। পাশাপাশি উপকূল সুরক্ষার জন্য স্থাপিত জিওব্যাগ ও কংক্রিট কাঠামো সৈকতের সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন করছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়াকাটার অন্যতম বৈশিষ্ট্য একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের সুযোগ। কিন্তু পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান এবং পর্যটকবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে এই গন্তব্য ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।

জেলা প্রশাসক ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী জানান, কুয়াকাটার উন্নয়নে পর্যটন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। জিওব্যাগ ও কংক্রিট কাঠামোর অংশ অপসারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আচরণগত উন্নয়ন এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

• ঈদুল আজহায় ১০ দিনে কক্সবাজারে পর্যটক: প্রায় ৭ লাখ
• ঈদুল ফিতরে ৮ দিনে পর্যটক: প্রায় ১২ লাখ
• কক্সবাজারে হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউস: ৫০০-এর বেশি
• দৈনিক আবাসন সক্ষমতা: প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার
• ঈদুল আজহায় পর্যটন ব্যবসা: প্রায় ৬০০ কোটি টাকা
• ঈদুল ফিতরে পর্যটন ব্যবসা: প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা