আফ্রিকার সাফারি ভ্রমণ মানেই একসময় ছিল বিগ ফাইভ প্রাণী দেখার উত্তেজনা। তবে সময় বদলেছে। এখন অভিজ্ঞ পর্যটকেরা খুঁজছেন ভিন্ন কিছু, আরও জীবন্ত, আরও বিরল অভিজ্ঞতা। সেই তালিকায় দ্রুত উঠে এসেছে আফ্রিকান ওয়াইল্ড ডগ বা পেইন্টেড উলফ। একসময় যাদের ‘অপ্রয়োজনীয় শিকারি’ ভেবে হত্যা করা হতো, আজ তারা সাফারির অন্যতম আকর্ষণ, আর তাদের ঘিরেই গড়ে উঠছে নতুন সংরক্ষণ আন্দোলন।
আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ও জলাভূমিতে এই প্রাণী দেখা পাওয়া এখন যেন ভাগ্যের ব্যাপার। সাফারি গাইডদের মধ্যে একটি প্রচলিত কথা আছে, ওয়াইল্ড ডগকে আপনি খুঁজে পাবেন না, তারা নিজেরাই আপনাকে খুঁজে নেয়। প্রতিদিন প্রায় ১০ মাইল পর্যন্ত চলাফেরা করা এই দ্রুতগামী শিকারিদের দেখা পাওয়া সত্যিই কঠিন। আর সেই দুর্লভতাই তাদের প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
বর্তমানে পৃথিবীতে আনুমানিক ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার আফ্রিকান ওয়াইল্ড ডগ বেঁচে আছে। আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, মানুষের সঙ্গে সংঘাত এবং বিভিন্ন রোগ তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অত্যন্ত সামাজিক এই প্রাণীরা দলবদ্ধভাবে শিকার করে এবং তাদের আচরণও অনন্য। শিকার শুরুর আগে তারা হাঁচির মতো শব্দ করে দলগত সিদ্ধান্ত নেয়, যা গবেষকদের কাছেও বিস্ময়ের বিষয়।
১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত অনেক জাতীয় উদ্যানে এই প্রাণীদের নির্বিচারে হত্যা করা হতো। ধারণা ছিল তারা হরিণ ও অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। পরে গবেষণা ও তথ্যচিত্রের মাধ্যমে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে তারা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯০ সাল থেকে আইইউসিএন তাদের বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যা সংরক্ষণে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
বর্তমানে সাফারি পর্যটনই হয়ে উঠেছে তাদের টিকে থাকার বড় ভরসা। পর্যটন খাতের আয় সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় অর্থনৈতিক যুক্তি তৈরি করছে, যাতে এসব জমি কৃষি বা খনিজ প্রকল্পে ব্যবহৃত না হয়। বিভিন্ন সাফারি ক্যাম্প সংরক্ষণ সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা, জিপিএস কলার সরবরাহ, মাঠ পর্যায়ের যানবাহন এবং তহবিল সহায়তা দিচ্ছে।
মোজাম্বিকের গোরোঙ্গোসা ন্যাশনাল পার্ক এখন আফ্রিকান ওয়াইল্ড ডগের অন্যতম নিরাপদ আশ্রয়স্থল। গৃহযুদ্ধের সময় যেখানে ৯০ শতাংশ বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী হারিয়ে গিয়েছিল, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ফলে এখন ৩০০-এর বেশি ওয়াইল্ড ডগ বাস করছে। একইভাবে জিম্বাবুয়েতে একটি বিপন্ন দলকে স্থানান্তর করে নতুন এলাকায় বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় থাকে।
পর্যটনের সঙ্গে গবেষণার এই সংযোগ তৈরি করেছে নতুন ধরনের নাগরিক বিজ্ঞান। সাফারি গাইডরা প্রতিদিনের পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন। পর্যটকেরা তোলা ছবি এখন এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে আলাদা আলাদা প্রাণী শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে করে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ সহজ হচ্ছে।
বর্তমানে অনেক সাফারি প্রতিষ্ঠান পর্যটকদের সরাসরি সংরক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। গবেষকদের সঙ্গে মাঠে কাজ দেখা, প্রাণী শনাক্ত করা, এমনকি কখনও কখনও উদ্ধার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতাও দেওয়া হচ্ছে। ফলে সাফারি এখন শুধু দর্শনের অভিজ্ঞতা নয়, বরং অংশগ্রহণমূলক সংরক্ষণ উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।