সমুদ্রের ধারে বসে ল্যাপটপে কাজ, পাশে কফির কাপ আর সামনে নীল জলরাশি। এমন জীবন এখন অনেক ডিজিটাল নোম্যাডের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ হয়ে উঠেছে ভিয়েতনামের উপকূলীয় শহর দা নাং। বিদেশি ইউটিউবার আর ভ্লগারদের ভিডিওতে শহরটি মানে কম খরচে আরামদায়ক জীবন, আধুনিক কোওয়ার্কিং স্পেস আর পর্যটন সুবিধার সহজ প্রাপ্যতা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই চিত্র সব সময় এতটা রঙিন নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দা নাং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ তালিকায় নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছে। একসময় নিউইয়র্ক টাইমস একে ভিয়েতনামের মিয়ামি বলে উল্লেখ করেছিল। ২০২৫ সালে অনলাইন কমিউনিটি নোম্যাডস ডটকম দা নাংকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল নোম্যাড গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করে। তিন মাসের ই ভিসা সহজে পাওয়া যায়, সমুদ্রঘেঁষা অবকাঠামো আধুনিক, জীবনযাত্রার খরচ তুলনামূলক কম। এই সব মিলিয়ে শহরটি দূরবর্তী কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই উত্থানের নেতিবাচক দিকও আছে। হুয়ে শহর থেকে আসা ৩৮ বছর বয়সী এনগো জুয়ান থাও দা নাংয়ে এসেছিলেন কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য খুঁজতে। আন্তর্জাতিক একটি এনজিওতে তাঁর মাসিক বেতন ছিল প্রায় ৪৫৫ ডলার। অথচ শহরের কেন্দ্রে একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া ছিল সেই আয়ের অর্ধেকের বেশি। আলাদা শোয়ার ঘর চাইলে পুরো বেতনের সমান খরচ হতো। কয়েক মাস পর বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়িয়ে দিলে তাঁকে শহর ছাড়তে হয় এবং প্রায় ২০ মাইল দূরের হোই আন শহরে চলে যেতে হয়, যেখানে ভাড়া তুলনামূলকভাবে কম।
থাওর মতে, অনেক বাড়িওয়ালা এখন স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার দিকে ঝুঁকছেন। কারণ বিদেশিরা বেশি ভাড়া দিতে রাজি। ফলে স্থানীয়দের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বাসা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জনপ্রিয় সৈকত এলাকায় হোটেল আর সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ায় সাধারণ বাসস্থানের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, শহরের কিছু উদ্যোক্তা ডিজিটাল নোম্যাডদের আগমনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। একটি কোওয়ার্কিং স্পেস পরিচালনাকারী হানা গুয়েন জানান, বিদেশিরা স্থানীয় ডিজাইনার, অনুবাদক ও সহকারী নিয়োগ দিচ্ছেন। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং সেবা খাত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাঁর মতে, ভাড়া বৃদ্ধির বড় কারণ স্বল্পমেয়াদি পর্যটন, শুধু নোম্যাড নয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের মার্চে ভিয়েতনাম সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দা নাংয়ে এয়ারবিএনবি ও ভ্রোবোর তালিকা প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। এখন রাতপ্রতি গড় ভাড়া ২০২৩ সালের তুলনায় কিছুটা কম হলেও ২০২২ সালের চেয়ে এখনো প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে প্রায় ২০ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক দা নাংয়ে এসেছিলেন। গত বছর সে সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে।
গবেষক ড্যানিয়েল শ্লাগভাইন মনে করেন, ডিজিটাল নোম্যাডদের উপস্থিতিতে অনেক শহরে অভিজাতকরণ দ্রুত হচ্ছে। তবে এটি শুধু নোম্যাডদের কারণে নয়, পুরো পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গেই জড়িত। চিয়াং মাইয়ের মতো শহরে স্থানীয়রা নোম্যাডদের স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ তাঁরা দীর্ঘ সময় থাকেন এবং নিয়মিত অর্থ ব্যয় করেন। তবে বালির অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা হয়ে আছে, যেখানে পর্যটন আর নোম্যাড সংস্কৃতির বিস্তারে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে।
৩৭ বছর বয়সী ডিজিটাল নোম্যাড সেরিং ইয়াংজম বলেন, দা নাংয়ে এখনো একধরনের ভারসাম্য আছে। বিদেশিরা শুধু ভ্রমণ নয়, অনেকেই স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই ভারসাম্য আর কত দিন থাকবে।
দা নাং এখন এমন এক শহর, যেখানে সমুদ্রতীরের কফিশপে বসে কাজ করা বিদেশি আর বাড়িভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা স্থানীয় একই বাস্তবতায় বাস করেন। সুযোগ যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি চাপও বাড়ছে। ডিজিটাল নোম্যাডদের কাছে শহরটি এখনো স্বস্তির জায়গা। কিন্তু অনেক স্থানীয়ের কাছে এটি দ্রুত বদলে যাওয়া এক জনপদ।