বিশ্বে কোন শহরকে মানুষ রোমান্সের শহর হিসেবে বেশি চেনে। অবশ্যই সেটি প্যারিস। শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা এক ধারণা, যা আধুনিক সময়ে হলিউড আরও জোরদার করেছে।
চিরচেনা প্যারিস—তুষারভরা স্নো গ্লোবের ভেতর আইফেল টাওয়ার, আর ভালোবাসা ও অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে তালাবদ্ধ সেতুগুলো।
কিন্তু ‘প্রেমের শহর’ হিসেবে প্যারিস কি এখনও তার সুনাম ধরে রেখেছে?
প্যারিস ভ্রমণে গিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও ফিচার লেখক লায়াম মারফি।
তিনি লিখেছেন, বিফোর সানরাইস সিনেমা যদি আমাদের কিছু শিখিয়ে থাকে, তবে তা হলো—ট্রেনও হতে পারে রোমান্সের জায়গা। যদিও ইথান হক আর জুলি ডেলপির দৃশ্যপট ছিল অনেক বেশি মনোরম, ভোরবেলার ইউরোস্টারের জানালার বাইরে ইংলিশ চ্যানেলের অন্ধকার দৃশ্যের তুলনায়।
তবে যাত্রাটা খুবই সহজ—শহরের কেন্দ্র থেকে কেন্দ্র, মাত্র দুই ঘণ্টার একটু বেশি সময়। চারজনের টেবিল-সিট বা মুখোমুখি দুজনের সিট—যা যাত্রাটাকে ৩০০ কিমি গতিতে ছুটে চলা এক রেস্তোরাঁ-ডেটের মতো মনে করায়।
আমি শ্যাম্পেনের প্রস্তাব তুলেছিলাম, কিন্তু আমার স্ত্রী বললেন, সকাল সাতটায় সেটা খুব একটা রোমান্টিক নাও হতে পারে। তাই আমরা পেস্ট্রি আর আপেল কমপোটসহ দইয়ের সাধারণ নাশতায় সন্তুষ্ট হলাম। ফেরার পথে, ইউরোস্টারের প্রিমিয়ার সার্ভিসে, সৃজনশীল, ক্লাসিক ও সুগন্ধি নানা পদের ডিনার পরিবেশন করা হয়।
গার দু নর থেকে হাঁটতে হাঁটতে বৃষ্টির ঢেউ প্যারিসের রাস্তাকে শহরজুড়ে এক ক্যাবারে শোয়ের মতো করে তুলল—ছাতাগুলো বারবার খুলছে-বন্ধ হচ্ছে। দশম অ্যারোঁদিসমঁতে ঢুকতেই চারপাশটা বেশ ট্রেন্ডি হয়ে উঠল, আর সেখানেই সপ্তাহান্তের জন্য আমাদের আশ্রয় খুঁজে পেলাম।
সেন্ট ডেনিসের কাছে অবস্থিত হোটেল প্রভিডেন্সে ক্লাসিক প্যারিসিয়ান রোমান্সের আবহ। আমাদের ঘরটি ছোট হলেও, দুটি জানালা থেকে নিচের রাস্তাগুলোর নিখুঁত দৃশ্য দেখা যায়— ভিড়ের অংশ হয়েও যেন আলাদা থাকা যায়। আশপাশে থিয়েটার আর বিকল্প ধাঁচের ক্যাফে। ক্যানাল সাঁ-মার্তাঁর ধারে হাঁটতে হাঁটতে শুক্রবার বিকেলের প্যারিসকে শান্ত ও স্নিগ্ধ মনে হলো।
অসংখ্য বিস্ত্রোর মধ্যেই পাওয়া যায় উষ্ণ, ঐতিহ্যবাহী অভ্যর্থনা। স্থানীয় এক বন্ধুর পরামর্শে আমরা বিস্ত্রো ভিক্তোয়ারে ঢুকলাম—কাঠের পুরোনো বারের পাশ কাটিয়ে, এসকারগো খেতে ব্যস্ত প্যারিসিয়ানদের ভিড়ের মাঝে।
এক তরুণ স্থানীয় দম্পতি আমাদের বললেন, প্যারিসের প্রতীক কীভাবে পর্যটকদের প্রভাবিত করে।
নেটফ্লিক্স সিরিজ Emily in Paris অনেকের কাছে আধুনিক প্যারিসের ধারণা তৈরি করেছে। এর ফ্যাশনপ্রেমী চরিত্র ও নিখুঁত সেট বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু পুরোনো বারের ব্যস্ততা আর প্রাণচাঞ্চল্য দম্পতিদের মুহূর্ত উপভোগ করতে আহ্বান জানায়।
রোমান্স জাগাতে তারা পরামর্শ দিল—যেমন আমরা করেছিলাম—ক্যানাল সাঁ-মার্তাঁর ধারে বা সেঁ নদীর শান্ত তীরে বসতে।
শহরের প্রাচীনতম প্রথম অ্যারোঁদিসমঁতে ঢুকতেই লুভরের বিখ্যাত কাঁচের পিরামিডের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা দম্পতিদের দেখা গেল। কেউ আনন্দে, কেউবা তর্কে—শহরের জটিল বিন্যাসে পথ খুঁজতে গিয়ে। সবাই খুঁজছে সেই অধরা প্যারিসীয় আবহ। সেঁ নদীর ওপর রংধনু আমাদের স্বাগত জানাল।
সন্ধ্যায় আমরা লাফায়েতসে গেলাম। “নিও-বুর্জোয়া” রান্না, আর সেই অর্থ বোঝাতে ট্র্যাভিস স্কট ও ড্রেকের বিটে অলংকৃত সাজসজ্জা কেঁপে উঠছে। সব প্যারিসই তো সিডনি বেচে বা জ্যাক ব্রেলের মতো নয়। তারকা শেফ মোরি সাকো পুরোনো ঐশ্বর্যময় প্যারিসে আধুনিকতার ছোঁয়া এনেছেন।
খাবার ছিল চমৎকার। লাফায়েতসের সিগনেচার বার্গারে ক্যারামেলাইজড মিষ্টতা আর নিখুঁত ব্রিওশের মচমচে স্বাদ। সরেল সসে স্যামনের ফিলে হালকা, তবু তৃপ্তিকর।
আসলে, Emily in Paris-এর একটি দৃশ্য এখানেই ধারণ করা হয়েছিল। বড় টেবিলকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে দম্পতিদের পাশে সরিয়ে দেওয়া হয়—যেন জায়গাটা বন্ধুদের আড্ডার জন্যই। আমরা রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়লাম, ক্যাফের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে।
রাতে আমরা ঢুকে পড়লাম সেই জায়গায়, যা শহরটিকে লাল আভা দেয়—মুলাঁ রুজ। মনমার্ত্রের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ঘূর্ণায়মান চাকার নিচে, মেরুন ভেলভেট আর পালকের জগতে প্রবেশ করলাম।
এটি পর্যটকদের আকর্ষণকেন্দ্র—প্রেমের আগুন জ্বালানোর স্থান কমই। তবু লাল আলো আর সজ্জায় এক ধরনের আকর্ষণ আছে। জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক ও আংশিক নগ্নতায় ভরপুর পরিবেশনা দৃষ্টিনন্দন। শেষ প্রশ্ন ভেসে এলো—“আমি কেন প্যারিসকে ভালোবাসি?”—“কারণ আমার ভালোবাসা এখানে।”
সপ্তাহান্তের ভোরে তুইলেরি উদ্যানে ফোয়ারার চারপাশের শান্ত পরিবেশে প্রিয়জনের পাশে ডুবে যাওয়ার মতো অনুভূতি জাগে—হয়তো একটি চুম্বনে জেগে ওঠা যায়।
মনে দ্য প্যারিতে এম. সি. এসশারের গাণিতিক শিল্পকর্মের প্রদর্শনী, তারপর মিউজে ল’ওরঁজরিতে ক্লদ মোনের ওয়াটার লিলিস—শহরের শিল্পভাণ্ডারের সমৃদ্ধি বোঝায়।
মনমার্ত্রে ল্য পতি ব্লুর সামনে ডালিমের রস বানানো সামিরের হাসিতে আমরা আন্তরিকতা খুঁজে পেলাম। তাজিনের সুগন্ধি সবজি আমাদের সাক্রে কোরে ওঠার প্রস্তুতি দিল। হয়তো এটি ক্লাসিক প্যারিস নয়, কিন্তু শহরটি যেন এমন ছোট্ট, ঘরোয়া রত্ন আবিষ্কারে আমন্ত্রণ জানায়।
ভালোবাসা হয়তো প্যারিসের বাতাসে ভেসে বেড়ায় না; তা হয়তো বিস্ত্রোর উষ্ণ কোণে বসে থাকে, কিংবা লোহার-গ্লাসে সাজানো গলিপথে ভেসে যায়। ক্লাসিক কার্যকলাপগুলো সুখী দম্পতিদের সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আসলে শহরের সৌন্দর্যই আপনাকে একে অপরের কাছে টেনে আনে। প্যারিস যখন ফুটে ওঠে, তখন তাকে দেখার জন্য আপনাকে শুধু সঠিক জায়গায় থাকতে হবে।
ক্লিশে হওয়ার কারণ আছে—প্রেমের শহরে একটি চমৎকার ভ্যালেন্টাইনস সপ্তাহান্ত কাটানো এখনো সম্ভব।