কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্যান্ডারে সকালের নাশতা করছিলেন ওজ ফাজ। সামনে প্যানকেক, পাশে কফি। 
কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, জনপ্রিয় মিউজিক্যাল ‘কাম ফ্রম অ্যাওয়ের’ একটি সংলাপ সত্যিই গ্যান্ডারের বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলে যায়— গুজে যেতে হলে ট্যাক্সি নিতে হবে।
২০০১ সালে ওজ ছিলেন গ্যান্ডারের পুলিশ কর্মকর্তা। পুরস্কারজয়ী এই মিউজিক্যালের একটি চরিত্রও তাকে কেন্দ্র করে তৈরি। 
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ৩৮টি বিমানকে গ্যান্ডার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ৯ হাজার মানুষের এই শহরের সঙ্গে যুক্ত হন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরও প্রায় ৭ হাজার যাত্রী।
ওজ বলেন, “বেশিরভাগ আমেরিকান জানতেন না কানাডা কোথায়, গ্যান্ডার তো আরও নয়।” 
বিমান থেকে নেমে যাত্রীদের মুখে তিনি দেখেছিলেন হতাশা ও অনিশ্চয়তা। স্থানীয় একটি কলেজের নারীরা তাদের জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “আমরা তোমাদের দেখছি, চিন্তা করো না।”
নিউফাউন্ডল্যান্ডে এটাই যেন স্বাভাবিক। ওজ জানান, তার বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশীরা খাবার নিয়ে আসতে শুরু করেছিলেন। তার আট ভাইবোন এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে বিশাল পরিবারকে পাঁচ দিন খাওয়ানোর মতো খাবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জোগাড় হয়ে যায়। 
তিনি বলেন, “পরিবারে কেউ মারা গেলে পুরো সম্প্রদায় দায়িত্ব নেয়। এটাই আমাদের সংস্কৃতি।”
নিউফাউন্ডল্যান্ড আয়তনে আয়ারল্যান্ডের চেয়েও বড়, কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ লাখ। ১৯৩০-এর দশকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বিমান চলাচল শুরু হলে এখানে প্রথম বিমানবন্দর তৈরি হয়। আটলান্টিক পেরোনোর পর এটিই ছিল বিমানের প্রথম স্থলভাগ এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নেওয়ার জায়গা।
একসময় গ্যান্ডার পরিচিত ছিল ‘বিশ্বের চৌরাস্তা’ নামে। মেরিলিন মনরো, ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা, জিমি স্টুয়ার্ট ও এলিজাবেথ টেলরের মতো তারকারা এখানে এসেছেন। বিটলস ও এলভিস প্রিসলিও এই বিমানবন্দরের রানওয়েতে পা রেখেছেন। রানওয়ের সক্ষমতার কারণে একসময় এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর।
পরে বিমান চলাচলের ধরন বদলে গেলে গ্যান্ডার বিমানবন্দরের গুরুত্ব কমে যায়। পুরোনো টার্মিনাল ভবনটি ভেঙে ফেলার কথাও উঠেছিল। কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিবাদের পর ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে। এরপর অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এটি সংস্কার করা হয়। এখন সেখানে রেস্তোরাঁ ও সিনেমা হলও রয়েছে।
কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সবকিছু বদলে যায়।
সেদিন বিমানবন্দরের কর্মী রোন্ডা লেন টেলিভিশনে টুইন টাওয়ারে হামলার দৃশ্য দেখছিলেন। পরে যখন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেল, তখন তিনি বুঝতে পারেন— বিপুলসংখ্যক বিমান অন্যত্র পাঠানো হতে পারে। সেটিই সত্যি হয়েছিল।
বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের বিমান থেকে নামিয়ে ম্যানুয়ালি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এরপর স্কুল বাসে করে তাদের কলেজ, গির্জার হল ও অন্যান্য আশ্রয়স্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানবন্দরের প্রদর্শনীতে আজও টুইন টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া একটি স্টিলের অংশ রাখা আছে।
ওজের কাছেও সেই সময়ের অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। আটলান্টার এক পুলিশ কর্মকর্তার অনুরোধে তিনি তার বিমানে থাকা বোনকে খুঁজে বের করে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ঘটনাটি পরে একটি রেডিও স্টেশনে প্রচারিত হয় এবং পরিচিতি পায় ‘বিশ্বজুড়ে শোনা সেই আলিঙ্গন’ হিসেবে।
এমন আরও অনেক গল্প রয়েছে। এক যাত্রীকে স্থানীয় এক নারী নিজের বাড়িতে গোসল ও বিশ্রামের সুযোগ দিয়েছিলেন। যাত্রী যখন বলেছিলেন, চাইলে তিনি বাড়ির সবকিছু নিয়ে চলে যেতে পারেন, নারীটি শুধু বলেছিলেন—“সবকিছু আবার কেনা যাবে।”
গ্যান্ডারের আতিথেয়তা ৯/১১-এর পরও থেমে যায়নি। এক বড়দিনের আগের রাতে একটি বিমানে সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয়রা ট্যাক্সির অভাবে যাত্রীদের নিজের গাড়িতে করে হোটেলে পৌঁছে দেন। পরদিন রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় তারা যাত্রীদের জন্য নিজেরাই বড়দিনের খাবারের আয়োজন করেন।
কাছের অ্যাপলটনে ডার্ম ও ডায়ান ফ্লিন ছয়জন যাত্রীকে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ডার্মের ভাষায়, “তারা অপরিচিত হয়ে আসে, দ্বিতীয় দিনে বন্ধু হয়ে যায়, আর চলে যাওয়ার সময় পরিবারের সদস্য হয়ে যায়।”
পরে মিউজিক্যালের মাধ্যমে এই গল্প বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। গ্যান্ডারে সেই নাটক দেখতে বসে মনে হয়, এটি শুধু ৯/১১-এর গল্প নয়। ওজের ভাষায়, “এটা ৯/১১ নিয়ে নয়, এটা ৯/১২ নিয়ে।”
অর্থাৎ, বিপর্যয়ের পরের দিন মানুষ কীভাবে অপরিচিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল—গ্যান্ডারের গল্প মূলত সেই মানবিকতার গল্প।