নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নিভৃত এক গ্রামে সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চারশো বছরের পুরোনো বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদ। মোঘল স্থাপত্যরীতির অনন্য বৈশিষ্ট্য বহনকারী এই মসজিদ স্থানীয়দের কাছে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেও পরিচিত। ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও লোককথার মিশেলে এটি আজ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।

মসজিদটি অবস্থিত চাপিলা ইউনিয়নের বৃ-চাপিলা গ্রামে, জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে। সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদটির বর্ধিত অংশে সংস্কার কাজ করা হলেও মূল ভিত্তি, নকশা ও অলংকরণ আগের মতোই সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে প্রাচীন স্থাপত্যরীতির সঙ্গে নতুন সংযোজনের একটি সুষম সমন্বয় তৈরি হয়েছে।

ইতিহাসবিদদের ধারণা, মোঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলের কোনো এক সময়ে, অর্থাৎ সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি এই মসজিদ নির্মিত হয়। সে সময় চাপিলা ছিল একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং এখানে মোঘল সেনাদের অবস্থান ছিল। স্থানীয় কর্মকর্তা মুনশি এনায়েতউল্লাহ নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। তাঁর নাম একসময় মসজিদের গায়ে উৎকীর্ণ ছিল।

পরবর্তীকালে প্রশাসনিক গুরুত্ব হারালে অঞ্চলটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বসতি বিলীন হয়, চারপাশ ঘন জঙ্গলে ঢেকে যায়, আর লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায় মসজিদটিও। দেশভাগের পর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষ এখানে নতুন বসতি স্থাপন শুরু করেন। জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে তারা হঠাৎ মসজিদটির সন্ধান পান। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ আবিষ্কৃত হওয়ায় অনেকে একে অলৌকিকভাবে আবির্ভূত বলে প্রচার করেন, সেখান থেকেই ‘গায়েবি মসজিদ’ নামের প্রচলন।

ইট ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ ২০ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় চার ফুট। এতে রয়েছে তিনটি বিশাল গম্বুজ, দুই পাশে দুটি মিনার এবং অলংকৃত তিনটি প্রবেশদ্বার। ভেতরের দেয়াল ও মেহরাবে পোড়ামাটির সূক্ষ্ম নকশা মোঘল শিল্পরীতির পরিচয় বহন করে। দূর থেকে সোনালি আভাযুক্ত গম্বুজগুলো দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য সৃষ্টি করে।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় পুরো এলাকা বেতের জঙ্গল ও বন্য প্রাণীর আবাস ছিল। ষাটের দশকের দিকে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং মসজিদে আবার নিয়মিত নামাজ শুরু হয়। তখন নিরাপত্তার জন্য মুসল্লিদের পাহারা দিয়ে নামাজ আদায় করতে হতো।

বর্তমানে প্রতিদিন কয়েক দশ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন এবং জুমার দিনে কয়েকশ মানুষের সমাগম ঘটে। মুসল্লি সংখ্যা বাড়ায় মসজিদ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, তবে মূল স্থাপত্য অক্ষুণ্ন রাখার দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, ঐতিহাসিক এই মসজিদের সংরক্ষণ, অলংকরণ পুনরুদ্ধার এবং দর্শনার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ হলে এটি অঞ্চলের ইতিহাসচর্চা ও দর্শনীয় স্থানের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।