বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাতারা যেভাবে একটি গন্তব্যকে তুলে ধরছেন, তা অনেক ক্ষেত্রে সেই গন্তব্যের প্রকৃত এবং বহুমাত্রিক পরিচয়কে বিকৃত করছে। এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘ক্রিয়েটর মনোকালচার’।

ক্রিয়েটর মনোকালচার বলতে এমন এক বিশেষ প্রবণতাকে বোঝায়, যেখানে কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা একটি গন্তব্য নিয়ে প্রায় সবাই একই ধরনের গল্প, একই ধরণের সঙ্গীত এবং একই ধরণের দৃশ্য বা অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করে কনটেন্ট বানিয়ে থাকেন।

পর্যটন বিশ্লেষক রাফাত আলী সম্প্রতি বলছেন, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমন কনটেন্টকে বেশি প্রাধান্য দেয়, যা দ্রুত ভিউ, লাইক ও শেয়ার আনে। ফলে নির্মাতারা গভীর, প্রেক্ষাপটসমৃদ্ধ বা গবেষণাভিত্তিক গল্পের বদলে চটকদার, আবেগপ্রবণ বা বিতর্কিত বিষয় বেছে নেন। এতে একটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল ও মানুষের বাস্তব জীবনধারার জটিলতা হারিয়ে গিয়ে সরলীকৃত এবং অনেক সময় ‘স্টেরিওটাইপধর্মী’ চিত্র সামনে নিয়ে আসেন।
ভ্রমণবিষয়ক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘স্কিফটে’ এক নিবন্ধে রাফাত আলী বলেন, কোনো কম-পরিচিত দেশ সম্পর্কে ইউটিউবে খুঁজলে প্রায়ই দেখা যায় কয়েকটি নির্দিষ্ট ও চটকদার বিষয়ের ওপর অসংখ্য ভিডিও তৈরি হয়েছে। সেই বিষয়গুলোই অ্যালগোরিদমের মাধ্যমে বারবার সামনে আসে এবং ধীরে ধীরে সেটিই দেশটির ‘ডিজিটাল পরিচয়’ হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, ‘অথচ বাস্তবে দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে খুব কম কনটেন্ট পাওয়া যায়। এভাবে একটি সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি পুরো দেশের পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়।’

বাংলাদেশে সাজেক নিয়ে বেশির ভাগ কনটেন্টের শিরোনামেই লেখা থাকে, ‘মেঘের রাজ্য’। এই মেঘ মিশিয়ে সাজেক এত বেশি উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সাজেকে মেঘ ছাড়া আর কিছুই দেখার নেই। যদিও স্থানীয়দের জীবনযাপন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে অনেক কিছুই দেখার আছে; জানার আছে।
কিন্তু এই ‘সরলীকৃত উপস্থাপন’ কেবল দর্শকদের ধারণা গঠনে প্রভাব ফেলে না, বরং পর্যটন প্রবাহ, বিনিয়োগ এবং গন্তব্য বিপণন কৌশলেও প্রভাব বিস্তার করে।
সম্ভাব্য পর্যটকরা একটি বিকৃত বা অসম্পূর্ণ ধারণা নিয়ে ভ্রমণে যান, যা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে না মেলায় অনেক সময় হতাশার জন্ম দেয়।

একইসঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, কারণ তাদের সংস্কৃতি বা জীবনধারা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও (এআই) এক্ষেত্রে দায়ী। অনেক ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম ও সার্চ সিস্টেম এখন অনলাইন কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে ভ্রমণ পরামর্শ দেয়। যদি সেই কনটেন্টই একপেশে বা অতিরঞ্জিত হয়, তবে এআই সিস্টেমও একই ‘স্টেরিওটাইপ’ পুনরুৎপাদন করবে। ফলে একটি ভুল ধারণা আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

এজন্য গন্তব্যগুলোর প্রকৃত পরিচয় রক্ষার জন্য আরও দায়িত্বশীল ও বৈচিত্র্যময় গল্প বলার প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের কণ্ঠ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করতে হবে। নইলে ডিজিটাল যুগে গন্তব্যের স্বকীয়তা হারিয়ে গিয়ে সেটি কেবল অ্যালগোরিদমনির্ভর একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হবে।