প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, লোকগাথা আর বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানে ভরপুর ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা ধীরে ধীরে নজর কাড়ছে ভ্রমণপ্রেমীদের। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে সম্ভাবনাময় এই অঞ্চল এখনো গড়ে উঠতে পারেনি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখান থেকে বছরে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় সম্ভব।
৩৯৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় রয়েছে বিস্তীর্ণ শাল-গজারি বন, প্রাকৃতিক জলাশয় এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন। ময়মনসিংহ জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ বদ্ধ জলাশয় বড়বিলা। পদ্ম, শাপলা ও শালুকের সৌন্দর্যের পাশাপাশি বিলের ভেতরে থাকা রহস্যঘেরা ‘নবাইকুরি’ পর্যটকদের আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
শীত মৌসুমে বড়বিলায় ভিড় করে দেশি-বিদেশি অতিথি পাখি। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী নৌকাভ্রমণের মাধ্যমে প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে এখানে আসেন। তবে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বড়বিলার পাশেই রয়েছে লোককথায় ঘেরা আনই রাজার ভিটা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এখানে একসময় আনই রাজার লোহার প্রাসাদ ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে খাল দিয়ে ঘেরা সেই প্রাসাদ এক ভয়াবহ ঝড়ে বিলীন হয়ে যায়। এই গল্প এখনো পর্যটকদের কৌতূহল জাগিয়ে রাখে।
অন্যদিকে, কেশরগঞ্জ বাজার থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে সন্তোষপুর বনাঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আরেকটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানে শাল-গজারি বনের পাশাপাশি রয়েছে বিশাল রাবার বাগান। রাবার গাছ থেকে কষ সংগ্রহের দৃশ্য কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।
এই বনাঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় আকর্ষণ প্রায় পাঁচ শতাধিক বন্য বানর। মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার কারণে দর্শনার্থীরা এদের ‘সামাজিক বানর’ নামে ডাকেন। বিশেষ করে শিশুদের কাছে এটি বাড়তি আনন্দ যোগ করে।
এনায়েতপুর ইউনিয়নের দুলমা গ্রামে অবস্থিত ব্যক্তিমালিকানাধীন দীপ্ত অর্কিড বাগানেও দেশি-বিদেশি ফুল ও ফলের সমাহার রয়েছে। পথে পড়বে ঐতিহ্যবাহী তমালতলা গুপ্তবৃন্দাবন, যা স্থানীয়ভাবে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এছাড়া বেতবাড়ী গ্রামে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে একটি বিনোদন পার্ক।
ঢাকা থেকে সকালে রওনা দিয়ে একদিনেই এসব স্থান ঘুরে রাতেই ফেরা সম্ভব। ময়মনসিংহ সদর থেকে বাস বা সিএনজিতে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় ফুলবাড়ীয়া পৌঁছানো যায়। জনপ্রতি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে স্বল্প ব্যয়ে ভ্রমণ সম্পন্ন করা সম্ভব।
স্থানীয়দের দাবি, পরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও প্রচার বাড়ানো হলে ফুলবাড়ীয়া দ্রুতই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।