মৌলভীবাজার শহরের মনু নদের তীরে বসন্তের সকালে হঠাৎই চোখে পড়ে এক অপূর্ব দৃশ্য। সৈয়ারপুর এলাকায় একটি বরুণগাছ যেন সাদা-হলুদ ফুলের ঢেউয়ে ভেসে উঠেছে। দূর থেকে মনে হয়, গাছটির ডালপালা জুড়ে নেমে এসেছে মৃদু আলোর ঝরনা।
শুক্রবার সকালে ফরেস্ট অফিস রোড ধরে হাঁটতে গিয়ে দেখা যায়, ঝোপালো গাছটির পাতার চেয়ে ফুলই বেশি দৃশ্যমান। প্রতিটি শাখায় সাদা, হালকা হলুদ আর বেগুনি আভা মেশানো ফুল ফুটে আছে। বসন্তের হালকা বাতাসে পাপড়ি ঝরে পড়ছে, নিচের ঘাস ঢেকে যাচ্ছে ফুলের আস্তরণে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর বসন্ত এলেই এই বরুণগাছ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। কোনো মানুষের বিশেষ যত্ন ছাড়াই প্রাকৃতিক নিয়মে বেড়ে ওঠা এই গাছটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বসন্তের বার্তা বয়ে আনছে। ধারণা করা হয়, মনু নদের স্রোতে ভেসে আসা বীজ থেকেই গাছটির জন্ম।
বরুণগাছ সাধারণত জলাভূমি এলাকায় বেশি জন্মায়। হাওর-বাঁওড়, নদী বা খালের পাড়ই এর স্বাভাবিক আবাসস্থল। সেই তুলনায় শহরের ভেতরে এমন গাছ এখন তুলনামূলকভাবে বিরল। তবে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরসহ আশপাশের এলাকায় এখনো বেশ কিছু বরুণগাছ টিকে আছে, যেগুলো বসন্তে ফুলে ভরে ওঠে।
উদ্ভিদবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বরুণ একটি ছোট থেকে মাঝারি আকারের বৃক্ষ। সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। এর বাকল ধূসর-বাদামি এবং মসৃণ। ফুলে থাকে চারটি পাপড়ি এবং ২০ থেকে ২৫টি বেগুনি রঙের পুংকেশর, যা দেখতে আকর্ষণীয়। ফুল ঝরে গেলে গোলাকার বা ডিম্বাকার ফল ধরে।
বাংলাদেশে বরুণ ফুল গ্রীষ্মের অন্যতম বনফুল হিসেবে পরিচিত। প্রায় এক মাস ধরে গাছে ফুল থাকে। বর্ষাকালে পানি জমলেও গাছটি টিকে থাকতে পারে। ভেষজ গুণের জন্যও এই গাছের পরিচিতি রয়েছে। এর কাঁচা ফল রান্না করে খাওয়া যায়।
প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বরুণগাছ শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, বরং মৌসুমি সৌন্দর্যের প্রতীক। শহরের ব্যস্ততার মাঝে মনু নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটি যেন প্রকৃতির নীরব বার্তা পৌঁছে দেয়—ঋতু বদলালেই ফিরে আসে নতুন রঙ, নতুন জীবন।