মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। তিন দশক আগে জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পরও সীমানা নির্ধারণ না হওয়া, অবাধ দখল, বনজ সম্পদ চুরি এবং নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বনাঞ্চল। প্রাণবৈচিত্র্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

১৯৯৬ সালে ১২৫০ হেক্টর আয়তনের লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এখানে ৪৬০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাস। তবে বর্তমানে এসব প্রজাতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, বন বিভাগের কার্যকর তদারকির অভাবেই পরিস্থিতি এমন হয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা সীমানা নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা। ৩০ বছরেও বনের সীমানা চূড়ান্ত না হওয়ায় আশপাশের জমির মালিকরা বনভূমি দখল করে বাগান ও স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।

বনের ভেতর দিয়ে সড়ক ও রেলপথ চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নির্ধারিত গতিসীমা ২০ কিলোমিটার থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে প্রতিনিয়ত বন্যপ্রাণী গাড়ি ও ট্রেনের ধাক্কায় মারা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ লাইনের স্পর্শেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চলা গাছ, বাঁশ ও বেত চুরির কারণে বনের ঘনত্ব কমে গেছে। এতে প্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়ায় খাদ্য ও পানির সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষের আঘাতে মারা পড়ে।

স্থানীয়রা জানান, একসময় এই বনে সহজেই উল্লুকসহ বিভিন্ন প্রাণী দেখা যেত। এখন বানর, বন্যশূকর ও কিছু সরীসৃপ ছাড়া অন্য প্রাণীর উপস্থিতি কমে গেছে। পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। অনেকেই টিকিট ছাড়া প্রবেশ করে ময়লা ফেলে ও উচ্চ শব্দ করে বনের পরিবেশ নষ্ট করছেন।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ বলছে, খাদ্য সংকট নেই এবং সীমানা নির্ধারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব উদ্যোগের প্রভাব খুব কমই দৃশ্যমান।

পরিবেশবাদীরা দ্রুত সীমানা নির্ধারণ, দখলমুক্তকরণ এবং পর্যটক নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পর্যটক প্রবেশ সীমিত করতে হবে।