লেখক: আদিব রহমান ইথার

আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের ফুকেট ভ্রমণে গিয়েছিলাম। সময়ের হিসেবে হয়তো খুব বেশি দিন নয়, কিন্তু সেই সফরের কিছু মুহূর্ত এখনও এতটাই জীবন্ত যে চোখ বন্ধ করলেই সবকিছু আবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমুদ্রের নীল জল, আন্দামান সাগরের ঢেউ, ফি ফি আইল্যান্ডের সৌন্দর্য, আর সেই ভয়ংকর অসুস্থতার রাত, সব মিলিয়ে ফুকেট আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং স্মরণীয় ভ্রমণগুলোর একটি।

ভ্রমণ বলতে সাধারণত মানুষ আনন্দ, নতুন জায়গা দেখা আর সুন্দর স্মৃতির কথা বোঝে। কিন্তু কখনো কখনো ভ্রমণ এমন কিছু অভিজ্ঞতা উপহার দেয়, যা আনন্দের চেয়েও অনেক গভীর হয়ে যায়। এই সফরটা আমার কাছে ঠিক তেমনই ছিল।

ব্যাংকক থেকে কানেকটিং ফ্লাইট ধরে আমরা ফুকেটে পৌঁছাই। প্রথম দেখাতেই শহরটাকে অন্যরকম লেগেছিল। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পরই চোখে পড়ে সাজানো রাস্তা, পর্যটকদের ব্যস্ততা, আর সমুদ্রঘেঁষা এক মুক্ত পরিবেশ। চারদিকে যেন ভ্রমণের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে ছিল। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি থাকলেও মনে ছিল প্রবল উত্তেজনা। কারণ বহুদিন ধরেই থাইল্যান্ডের বিখ্যাত এই দ্বীপ শহরটাকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছে ছিল।

হোটেলে পৌঁছে সবকিছু ঠিকঠাকভাবে গুছিয়ে নিলাম। সুন্দর পরিবেশ, শান্ত আবহ সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল সামনে দারুণ কিছু দিন অপেক্ষা করছে। কিন্তু সেই রাতেই শুরু হলো বিপত্তি।

হঠাৎ করেই প্রচণ্ড জ্বর এলো। এমন জ্বর, যেখানে শরীরে হাত রাখাও কঠিন হয়ে যায়। সাথে ছিল অস্বাভাবিক কাঁপুনি। মনে হচ্ছিল পুরো শরীর যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঘন্টার পর ঘন্টা সেই কাঁপুনি চলছিল। বিদেশের মাটিতে অসুস্থ হওয়ার ভয়টা অন্যরকম। পরিচিত পরিবেশ নেই, নিজের দেশের মতো সহজ নিরাপত্তাবোধ নেই, শুধু এক ধরনের অসহায় অনুভূতি।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, গভীর রাতের পর জ্বর ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করে। যেন শরীর নিজেই নিজের সাথে যুদ্ধ করে কিছুটা শান্ত হলো। তখন মনে হয়েছিল হয়তো পরিস্থিতি সামলে গেছে। তাই পরদিন আর হোটেলে বসে থাকতে ইচ্ছে করলো না। ভাবলাম, এত দূর এসে অসুস্থতার কারণে পুরো ভ্রমণ নষ্ট করা যাবে না।

পরদিন আমরা বের হলাম পাতং বিচের দিকে। ফুকেটের সবচেয়ে প্রাণবন্ত জায়গাগুলোর একটি। চারদিকে মানুষের ভিড়, সমুদ্রের শব্দ, রোদের ঝিলিক, আর পর্যটকদের উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল দারুণ প্রাণচঞ্চল। আমরা ফি ফি আইল্যান্ডে যাওয়ার টিকেটও করছিলাম।

ঠিক তখনই ঘটে দ্বিতীয় ঘটনা।

হঠাৎ মনে হলো শরীরের ভেতরে অদ্ভুত কিছু হচ্ছে। এক ধরনের দুর্বলতা পুরো শরীরকে গ্রাস করে ফেললো। পাশে থাকা নুসরাতকে শুধু ইশারায় কিছু বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তারপর মুহূর্তের মধ্যেই সব অন্ধকার হয়ে গেল।

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই।

আজও সেই মুহূর্তটা মনে পড়লে শিউরে উঠি। আল্লাহর রহমত আর নুসরাতের উপস্থিতি না থাকলে হয়তো ঘটনাটা আরও ভয়াবহ হতে পারতো। কারণ পড়ে যাওয়ার সময় মাথাটা সরাসরি ওর উপরেই পড়ে। যদি শক্ত রাস্তায় মাথা লাগতো, কী হতে পারতো তা ভাবতেও ভয় লাগে।

বিদেশের মাটিতে সেই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি যেটা আমাকে স্পর্শ করেছিল, তা হলো মানুষের মানবিকতা। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আশপাশের থাই মানুষজন ছুটে এসেছে। কেউ পানি দিচ্ছে, কেউ সাহায্য করার চেষ্টা করছে, কেউ উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা ভিন্ন হলেও তাদের আচরণে আন্তরিকতা ছিল নিখাদ।

আরও অবাক করার বিষয় ছিল, কয়েক মিনিট পরেই আমি যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে যাই। যেন কিছুই হয়নি। আবার হাঁটাহাঁটি, কথা বলা সবকিছু চলছিল আগের মতো। কিন্তু বাস্তবে সেই দুই দিনের অভিজ্ঞতা আমাদের দুজনের মনেই গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে নুসরাতের উপর দিয়ে যে মানসিক চাপ গিয়েছিল, তা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

তবুও ভ্রমণের সৌন্দর্য মানুষকে আবার টেনে নেয়। এরপর আমরা আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে চলে গেলাম বিখ্যাত ফি ফি আইল্যান্ডে। সমুদ্রের নীল জল, দূরের পাহাড়, ছোট ছোট দ্বীপ আর অপার্থিব সৌন্দর্য সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল। সেখানে গিয়ে সমুদ্র দেখেছি, নৌভ্রমণ করেছি, ছোট ছোট দ্বীপ ঘুরেছি, আর প্রকৃতির মুগ্ধতায় হারিয়ে গিয়েছি। হোটেলের সুইমিং পুলেও কিছুটা সময় কাটিয়েছি।

আজ দুই বছর পর সেই ছবিগুলোর দিকে তাকালে শুধু সুন্দর ভ্রমণের স্মৃতি চোখে পড়ে না। মনে পড়ে ভয়, অসুস্থতা, ভালোবাসা, সহানুভূতি আর জীবনের প্রতি নতুন এক উপলব্ধির কথা। বুঝতে পারি, ভ্রমণ শুধুমাত্র নতুন জায়গা দেখার নাম নয়; কখনো কখনো ভ্রমণ আমাদের নিজের মানুষদের আরও কাছ থেকে চিনতে শেখায়, আর শেখায় পৃথিবীতে এখনও মানবতা বেঁচে আছে।

ফুকেট তাই আমার কাছে শুধুই একটি পর্যটন শহরের নাম নয়। এটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় যেখানে ভয় ছিল, ভালোবাসা ছিল, আর ছিল জীবনের প্রতি নতুন করে কৃতজ্ঞ হয়ে ওঠার গল্প।