দক্ষিণ কোরিয়া এখন বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় ভ্রমণগন্তব্যগুলোর একটি। আধুনিক নগরজীবন, প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহনব্যবস্থা, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, স্ট্রিট ফুড ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিশেলে দেশটি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। তবে অনেকের ধারণা, দক্ষিণ কোরিয়া ঘুরতে গেলে বড় বাজেট প্রয়োজন। বাস্তবে আগেভাগে পরিকল্পনা করলে তুলনামূলক কম খরচেও সিউল, বুসানসহ দেশটির জনপ্রিয় গন্তব্যগুলো ঘুরে দেখা সম্ভব।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণ করে আসা জুনায়েদ আজিম চৌধুরী জানিয়েছেন, কিছু কৌশল অনুসরণ করলে যাতায়াত, থাকা, খাবার ও স্থানীয় পরিবহনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা যায়।

নিজেই ভিসা করলে খরচ কমবে

দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা আবেদন নিজেই সম্পন্ন করলে অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ এড়ানো সম্ভব। সাধারণত ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ফি নিয়ে থাকে।

ভিসার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার অফিসিয়াল ভিসা পোর্টালে ই-ফরম পূরণ করে সেটি প্রিন্ট করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ঢাকায় অবস্থিত দূতাবাসে আবেদন জমা দিতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের মধ্যে গত তিন বছরের ট্যাক্স রিটার্ন পেপার অন্যতম।

বর্তমানে আবেদন জমা দিতে আলাদা অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রয়োজন হয় না। সাধারণত ৩ থেকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

আগেভাগে টিকিট কাটলে সাশ্রয়

দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণের সবচেয়ে বড় খরচের একটি বিমানভাড়া। ভ্রমণের অন্তত ২ থেকে ৪ মাস আগে টিকিট বুক করলে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়।

বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিলের চেরি ব্লসম মৌসুম এবং অক্টোবর-নভেম্বরের শরৎকালে ঢাকা-সিউল রুটে টিকিটের দাম অনেক বেড়ে যায়। এ সময় রিটার্ন টিকিটের দাম ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

অন্যদিকে অফ সিজনে বিভিন্ন চীনা এয়ারলাইনসে ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যেও টিকিট পাওয়া যায়। তাই সময় নির্বাচনই এখানে সবচেয়ে বড় কৌশল।

সিউল ঘোরার সুবিধাজনক ট্রাভেল পাস

সিউল শহর ঘোরার জন্য ‘ডিসকভার সিউল পাস’ পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এই পাস ব্যবহার করে বিমানবন্দর ট্রেন, নির্দিষ্ট বাসসেবা ও ৭০টির বেশি পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশ সুবিধা পাওয়া যায়।

একই সঙ্গে এতে হাইস্পিড ইন্টারনেট ও গণপরিবহন ব্যবহারের সুবিধাও যুক্ত থাকে। অনলাইনে কয়েক দিনের প্যাকেজ কিনে নেওয়া যায়। সুবিধাভেদে খরচ পড়তে পারে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকার মধ্যে।

এ ছাড়া ‘ক্লাইমেট কার্ড’ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আনলিমিটেড সাবওয়ে ও সিটি বাসে চলাচল করা যায়। এতে দৈনিক পরিবহন ব্যয় অনেক কমে আসে।

কোথায় থাকলে খরচ কম

সিউলে পর্যটকদের সবচেয়ে জনপ্রিয় এলাকা মিয়ংডং। তবে এই এলাকায় হোটেল ভাড়া তুলনামূলক বেশি।

কম খরচে থাকতে চাইলে হংডে বা ডংডাইমুন এলাকা ভালো বিকল্প হতে পারে। হংডেতে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ক্যাফে, স্ট্রিট ফুড ও নাইটলাইফও সমৃদ্ধ।

বুসানে সমুদ্রসৈকতের কাছাকাছি থাকতে চাইলে হেউন্ডে জনপ্রিয় এলাকা। আর আরও কম বাজেটের জন্য সোমইয়ন তুলনামূলক সাশ্রয়ী।

পানির বোতল সঙ্গে রাখুন

দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক হোটেল, মেট্রোস্টেশন ও পাবলিক স্পেসে ফ্রি ওয়াটার ডিসপেনসার রয়েছে। তাই সঙ্গে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল রাখলে আলাদা করে পানি কিনতে হয় না।

ছোট এই অভ্যাস পুরো ভ্রমণে ভালো অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করতে পারে।

স্ট্রিট ফুডে মিলবে সাশ্রয়

সাধারণ রেস্টুরেন্টে এক বেলার খাবারে ১৫ থেকে ৩০ হাজার কোরীয় ওন পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে স্ট্রিট ফুড মার্কেটগুলোয় অনেক কম দামে জনপ্রিয় কোরীয় খাবার পাওয়া যায়।

সিউলের মিয়ংডং, হংডে কিংবা বুসানের বিভিন্ন মার্কেটে ৩ থেকে ৬ হাজার ওনের মধ্যেই খাবার পাওয়া সম্ভব। এসব খাবারের দোকানে পরিচ্ছন্নতার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শহর বদলে বাসে ভ্রমণ

দক্ষিণ কোরিয়ায় দ্রুত যাতায়াতের জন্য কেটিএক্স বুলেট ট্রেন জনপ্রিয় হলেও এর ভাড়া তুলনামূলক বেশি।

বাজেট বাঁচাতে চাইলে এক্সপ্রেস বাস ভালো বিকল্প। এসব বাস আরামদায়ক, সময়নিষ্ঠ ও তুলনামূলক কম খরচের।

অন্যদিকে নিয়মিত ট্যাক্সি ব্যবহার করলে বাজেট দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তাই সিউল ও বুসানের আধুনিক মেট্রো ও সিটি বাস ব্যবহার করাই বেশি সুবিধাজনক।

কেনাকাটায় ডাইসো হতে পারে সেরা অপশন

দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় রিটেইল চেইন ডাইসোতে কম দামে প্রয়োজনীয় ভ্রমণসামগ্রী পাওয়া যায়।

চার্জার অ্যাডাপ্টর, ছাতা, পানির বোতল, স্টেশনারি, স্কিনকেয়ার পণ্য কিংবা ছোট উপহারসামগ্রী ১ হাজার থেকে ৫ হাজার ওনের মধ্যেই কেনা সম্ভব।

কাছাকাছি স্পট একসঙ্গে ঘুরুন

এক দিনে কাছাকাছি এলাকার দর্শনীয় স্থান ঘুরলে সময় ও যাতায়াত খরচ দুটোই কমে।

যেমন মিয়ংডং, নামসান ও ডংডাইমুন একই দিনে ঘোরা যায়। আবার হংডে ও ইটেওনও কাছাকাছি এলাকা। পরিকল্পনা করে রুট সাজালে অল্প সময়েই বেশি জায়গা দেখা সম্ভব।

ফ্রি স্পটগুলো ঘুরে দেখুন

দক্ষিণ কোরিয়ায় এমন অনেক দর্শনীয় স্থান আছে, যেখানে প্রবেশে কোনো খরচ লাগে না।

সিউলের হ্যান রিভার পার্ক, নামসান পার্কের ওয়াকওয়ে কিংবা বুসানের গামচিওন কালচার ভিলেজ এলাকার বিভিন্ন ভিউ পয়েন্ট বিনা খরচে ঘুরে দেখা যায়।

এসব জায়গা ঘুরলে স্থানীয় জীবনযাপন ও শহুরে সংস্কৃতিও কাছ থেকে উপভোগ করা যায়।

আগে থেকেই দরকারি অ্যাপ ইনস্টল করুন

দক্ষিণ কোরিয়ায় ভ্রমণের সময় সঠিক ম্যাপ ও ট্রান্সপোর্ট অ্যাপ ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক সময় গুগল ম্যাপ পুরোপুরি নির্ভুল তথ্য দেখায় না। তাই স্থানীয়রা বেশি ব্যবহার করেন Naver Map। এতে রিয়েল-টাইম বাস, মেট্রো ও ট্রাফিক আপডেট পাওয়া যায়।

এ ছাড়া KakaoMetro অ্যাপ ব্যবহার করলে মেট্রো রুট ও ট্রেনের সময়সূচি সহজে বোঝা যায়। আগে থেকেই এসব অ্যাপ ইনস্টল করে রাখলে ভুল রুটে যাওয়া বা অপ্রয়োজনীয় ট্যাক্সি ভাড়া এড়ানো সম্ভব।