ঈদের টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটক বরণে প্রস্তুত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল। নতুন পানিতে ভরে ওঠা টাঙ্গুয়ার হাওর, স্বচ্ছ যাদুকাটা নদী, মেঘালয়ের পাহাড়ঘেরা টেকেরঘাট ও নীলাদ্রি লেককে ঘিরে ইতোমধ্যে জমে উঠেছে পর্যটন প্রস্তুতি। তবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দীর্ঘ যানজট ও ভোগান্তি এবার পুরো পর্যটন খাতের জন্য বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক পরিস্থিতির কারণে অনেক পর্যটক পুরোনো বুকিং বাতিল করছেন। নতুন বুকিংয়ের চাপও প্রত্যাশার তুলনায় কম। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র এবার পর্যটক কম পাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান পথ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এই পথে বর্তমানে দীর্ঘ যানজট নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আট ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে প্রায় একদিন।

শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকায় শ্যামলী পরিবহনের স্লিপার বাসে স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দেন বস্ত্র প্রকৌশলী স্বজন দেব। তিনি জানান, রোববার বিকেল ৩টায় সিলেটে পৌঁছান তারা। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকায় পুরো যাত্রা ছিল চরম ভোগান্তির।

শ্যামলী পরিবহনের সুনামগঞ্জের পরিবেশক হোসেন আহমেদ বলেন, সুনামগঞ্জ-সিলেট-ঢাকা সড়কে চলাচল এখন পরিবহন চালক ও যাত্রীদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্বরোড ও নারায়ণগঞ্জের রূপসী এলাকায় তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে। মাধবপুর-শায়েস্তাগঞ্জ এলাকাতেও রয়েছে ভোগান্তি।

এদিকে ঈদের সাত দিনের ছুটিকে সামনে রেখে হাওরাঞ্চলের হাউসবোট, হোটেল ও রিসোর্টগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। নতুন পানিতে টইটম্বুর হাওর এখন ভ্রমণের উপযুক্ত সময় বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটকরা বলছেন, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যই সুনামগঞ্জকে আলাদা আকর্ষণ দিয়েছে। মৌলভীবাজার থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা কামরুজ্জামান বলেন, যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ পানি, মেঘালয়ের সবুজ পাহাড় আর খোলা আকাশ মিলিয়ে পুরো পরিবেশ যেন অন্যরকম প্রশান্তি দেয়।

পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা সাহেলা বলেন, যাদুকাটা নদীতে নৌভ্রমণ তার কাছে সবসময়ই বিশেষ অভিজ্ঞতা। পাহাড়, নদী ও খোলা আকাশের সমন্বয় ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছে।

বরিশাল থেকে আসা এক নবদম্পতি বর্তমানে বারেক টিলায় অবস্থান করছেন। তারা জানান, জাদুকাটা নদী ও ভারতের পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক দৃশ্য তাদের ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলেছে।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আদনান বলেন, হাউসবোটে সময় ভালো কাটলেও সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে দীর্ঘ যানজটে পড়তে হয়েছে। সড়ক পরিস্থিতি ভালো হলে ভ্রমণ আরও স্বস্তিদায়ক হতো।

হৈমন্তি হাউসবোটের ব্যবস্থাপক রোকন উদ্দিন বলেন, ঈদকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রিপও শেষ হয়েছে। নতুন পানিতে পর্যটকরা এবার হাওরের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরাফাত হোসেন জানান, জেলার প্রায় দুই শতাধিক হাউসবোট পর্যটক বরণে প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে তাদের সংগঠনের আওতায় রয়েছে ১০৬টি হাউসবোট।

তিনি বলেন, ৩০ ও ৩১ মে’র বুকিং প্রায় পূর্ণ হলেও ২৮, ২৯ মে এবং জুনের প্রথম দিকের বুকিং তুলনামূলক কম। সড়ক ভোগান্তির কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তিনি আরও জানান, প্রতি পর্যটকের জন্য হাউসবোট প্যাকেজ মূল্য পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই দিন এক রাতের প্যাকেজে ছয় বেলা খাবার ও চার বেলা নাশতার পাশাপাশি টাঙ্গুয়ার হাওর, ওয়াচ টাওয়ার, টেকেরঘাট, নীলাদ্রি লেক, শিমুল বাগান, যাদুকাটা নদী ও বারেক টিলা ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ শহরের হোটেল গ্র্যান্ডের ব্যবস্থাপক অনিশ তালুকদার বাপ্পু বলেন, সড়ক ভোগান্তির কারণে তাদের কয়েকটি বড় গ্রুপ বুকিং বাতিল হয়েছে। পর্যটকরা হোটেলে পৌঁছেই দীর্ঘ যাত্রাপথের দুর্ভোগের কথা জানাচ্ছেন।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে রয়েছে জেলা পুলিশও। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে পুলিশি টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ঈদের ছুটিতে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারেন, সে বিষয়ে জেলা পুলিশ সতর্ক রয়েছে।