দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে বাংলাদেশের পতাকা উড়ালেন নুরুন্নাহার নিম্নি। মঙ্গলবার ভোরে নেপাল সময় সকাল ৫টা ২৪ মিনিটে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান তিনি। এর মধ্য দিয়ে ১৪ বছর পর কোনো বাংলাদেশি নারী আবারও এভারেস্টজয়ের ইতিহাস গড়লেন। খবরটি নিশ্চিত করেছে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব।

এর আগে ২০১২ সালে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন নিশাত মজুমদার। একই বছরের ২৬ মে শিখরে ওঠেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর পর বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় উঠলেন নুরুন্নাহার নিম্নি।

গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশে রওনা হন নিম্নি। কাঠমান্ডু ও লুকলা হয়ে পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে অতিউচ্চতার পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন তিনি। সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কে এভারেস্ট সামিটের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ধরা হয়।

চূড়ান্ত অভিযানের অংশ হিসেবে ১৭ মে বেজক্যাম্প ত্যাগ করেন নিম্নি। ধাপে ধাপে পৌঁছান ক্যাম্প-৩ এ। তবে ২২ মে ক্যাম্প-৪ এর উদ্দেশে যাত্রা করেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নিচে নেমে আসতে হয় তাঁকে।

পরে কয়েক দিন ক্যাম্প-২ এ অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষায় অবস্থান করেন তিনি। অবশেষে ২৫ মে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুকূলে এলে আবারও শুরু হয় শিখর অভিযাত্রা। সোমবার ক্যাম্প-৪ এ পৌঁছে সন্ধ্যায় চূড়ান্ত আরোহন শুরু করেন নিম্নি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নেপালের এইটকে এক্সপেডিশনের একজন শেরপা গাইড।

বর্তমানে পূবালী ব্যাংক পিএলসি–এর জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত নুরুন্নাহার নিম্নি। তাঁর এই অভিযানের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর ভূতত্ত্ব বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই পাহাড়ের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। ২০০৬ সালে ফিল্ডওয়ার্কে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর অভিযাত্রিক জীবনের শুরু বলে জানা যায়।

পরবর্তীতে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে নিয়মিত ট্রেকিং করেন তিনি। চাকরিজীবনে প্রবেশের পরও পাহাড়ের প্রতি টান কমেনি। ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন পর্বতাঞ্চলে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন নিম্নি।

২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্প সফরের পর আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। ২০২০ সালে সম্পন্ন করেন এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই পেশাদার পর্বতারোহণে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ে অবস্থিত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট–এ প্রশিক্ষণ নেন নিম্নি। একই বছর যুক্ত হন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সঙ্গে। এই সংগঠনের ব্যানারেই এবার এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেন তিনি।

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে প্রথম সফল অভিযান পরিচালিত হয় ১৯৫৩ সালে। ওই বছরের ২৯ মে নিউজিল্যান্ডের পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারি এবং নেপালের শেরপা তেনজিং নোরগে প্রথমবারের মতো এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান।

বাংলাদেশের হয়ে প্রথম এভারেস্টজয়ী হলেন মুসা ইব্রাহীম, যিনি ২০১০ সালের ২৩ মে শিখরে ওঠেন। এরপর এম এ মুহিত ২০১১ ও ২০১২ সালে দুবার এভারেস্ট জয় করেন। ২০১৩ সালে এভারেস্টজয়ী পঞ্চম বাংলাদেশি সজল খালেদ শিখর থেকে ফেরার পথে মারা যান।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে এভারেস্ট জয় করেন বাবর আলী। ২০২৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন ইকরামুল হাসান শাকিল। এবার ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট জয় করলেন নুরুন্নাহার নিম্নি।