কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন আবার পর্যটকে সরব হয়ে উঠছে, তখন উল্টো পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বড় ধরনের চাপে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পর্যটন অর্থনীতি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ভ্রমণ খাতের সংকট নয়, বরং বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমূর্তির পরিবর্তনেরও স্পষ্ট ইঙ্গিত।

বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় ৪০ লাখ কম বিদেশি পর্যটক যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। এতে দেশটির অর্থনীতিতে ৮০০ কোটির বেশি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। মহামারির সময় বাদ দিলে গত দুই দশকের মধ্যে এটিই আন্তর্জাতিক পর্যটনে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংকটের পেছনে অর্থনৈতিক মন্দা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণই বেশি দায়ী। কড়া অভিবাসন নীতি, শুল্ক যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং বৈদেশিক সম্পর্কের টানাপোড়েন বিদেশি পর্যটকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

বিশেষ করে জার্মানি, ভারত, ফ্রান্স, চিলি, অস্ট্রেলিয়া ও চীন থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে প্রতিবেশী কানাডা থেকে। সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে কানাডীয়দের অনীহা এবার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে।

অনেক কানাডীয় নাগরিকের অভিযোগ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতির কারণে তারা নিজেদের অসম্মানিত ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। ফলে নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা বা ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে তারা এখন জাপান, ইতালি ও ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।

টরন্টোর বাসিন্দা রে সিজার বলেন, “পৃথিবীতে ঘোরার মতো অসংখ্য সুন্দর জায়গা আছে। এখন আর যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সেই তালিকায় নেই।”

তিনি জানান, সম্প্রতি তিনি ও তার স্ত্রী নিউইয়র্ক সফরের পরিকল্পনা বাতিল করে জাপান ভ্রমণে গেছেন। ভবিষ্যতে ইউরোপ সফরের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

একই ধরনের প্রতিক্রিয়া এসেছে ইউরোপ থেকেও। সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক ক্যারিন উইলিয়ামস জানান, তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিদেশিদের জন্য আগের মতো স্বস্তিদায়ক নেই।

পর্যটন বিশ্লেষক অ্যাডাম স্যাকসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিগুলো স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে।

তার ভাষায়, “একসময় ভ্রমণ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী বাণিজ্য ভারসাম্য ছিল। এখন আমেরিকানরাই বিদেশে বেশি অর্থ ব্যয় করছেন, আর বিদেশিরা যুক্তরাষ্ট্র এড়িয়ে যাচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, ভিসা জটিলতা, অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয়, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আকাশপথেও বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী ভ্রমণে।

পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসাতেও। সিয়াটল, ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ার বহু পর্যটননির্ভর প্রতিষ্ঠান বুকিং কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার পর্যটন ব্যবসায়ী অ্যাডাম ডুফোর্ড জানান, গত এক বছরে তার প্রতিষ্ঠানের আয় অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে।

তিনি বলেন, “পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে আমাকে কয়েকজন কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি একটি দেশের ‘সফট পাওয়ার’-এরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশি পর্যটকেরা কোনো দেশে ভ্রমণ করলে সেই দেশের সংস্কৃতি, সমাজ ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পান। ফলে পর্যটক কমে যাওয়া মানে বিশ্বে একটি দেশের ইতিবাচক প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়া।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বিশ্লেষক জুলিয়েট কাইয়েম বলেন, “একসময় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ ছিল, যাকে বিশ্ব অনুসরণ করতে চাইত। এখন সেই ভাবমূর্তি অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

তবে সামনে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনকে ঘিরে কিছুটা আশাবাদ দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রায় ১০ লাখ বিদেশি পর্যটক যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সেটি যথেষ্ট হবে না।

তাদের পরামর্শ, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ইতিবাচক কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি কঠোর নীতিতে নমনীয়তা আনা এবং বৈশ্বিক পরিসরে ইতিবাচক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।