খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, একটা সময় ছিল, যখন আমেরিকান সংস্কৃতির প্রভাব জাপানের সমাজে ব্যাপকভাবে দেখা যেত।
উদাহরণ হিসেবে জাপানিদের বড়দিনে কেএফসি খাওয়ার ঐতিহ্য, লেভাইস জিন্সের জনপ্রিয়তা, ওসাকার আমেরিকান সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ, কিংবা বেসবলকে জাতীয় পর্যায়ের খেলায় পরিণত করার কথা টানা যায়।
কিন্তু সময় বদলেছে। বর্তমানে বিশ্বের সেরা বেসবল খেলোয়াড়দের একজন— জাপানের শোহেই ওতানি, যিনি এলএ ডজার্সের হয়ে খেলছেন।
জাপানি খাবার এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে জনপ্রিয়, আর অ্যানিমে ও মাঙ্গা বিশ্বজুড়ে মূলধারার সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
তবুও জাপানের আমেরিকাপ্রীতির একটি স্থায়ী স্মারক এখনো রয়ে গেছে। সেটা টোচিগি প্রিফেকচারের পাহাড়ে অবস্থিত পরিত্যক্ত ওয়াইল্ড ওয়েস্ট থিম পার্ক ওয়েস্টার্ন ভিলেজ।
ব্রিটিশ সাময়িকী ‘ফারআউট’ লিখেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে পরিত্যক্ত স্থাপনাগুলো সাধারণত দ্রুত ভাঙচুরের শিকার হয়। দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা হয়, ধাতব জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়, আর ময়লা-আবর্জনায় ভরে ওঠে। কিন্তু জাপানে পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও ওয়েস্টার্ন ভিলেজ আশ্চর্যজনকভাবে টিকে আছে।
১৯৭৩ সালে নিক্কো শহরে পার্কটি চালু হয়, যখন জাপানে আমেরিকান সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তুঙ্গে ছিল। হলিউডের ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রগুলো জন ওয়েন ও ক্লিন্ট ইস্টউডকে সুপারস্টারে পরিণত করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে থাকা জাপানের কাছে আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল ছিল স্বাধীনতা ও অভিযানের প্রতীক।
প্রথমে এটি একটি পশু খামার হিসেবে শুরু হলেও পরে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এটি আমেরিকান সীমান্ত অঞ্চলের আদলে গড়ে ওঠে, যেখানে ছিল সেলুন, গির্জা, দোকানপাট, এমনকি শেরিফের অফিসও।
জাপানের পাহাড়ের মধ্যে অবস্থান করলেও এটি দেখতে ও অনুভব করতে অনেকটাই ছোট্ট একটি আমেরিকান শহরের মতো ছিল।
পার্কটির আকর্ষণ এখানেই শেষ হয়নি। সেখানে আমেরিকার বিভিন্ন বিখ্যাত স্থাপনার প্রতিরূপ নির্মাণ করা হয়েছিল। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল মাউন্ট রাশমোরের বিশাল প্রতিকৃতি, যা মূল স্মৃতিস্তম্ভের প্রায় এক-তৃতয়াংশ আকারের বলে জানা যায়।
আরও আকর্ষণীয় ছিল পার্কজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অ্যানিম্যাট্রনিক রোবটগুলো। এসব যান্ত্রিক মানবসদৃশ চরিত্র কাউবয় ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকায় অভিনয় করত। বাস্তব অভিনেতাদের সঙ্গে মিলে তারা পুরো শহরটিকে জীবন্ত করে তুলত। দর্শনার্থীরা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে নানা দৃশ্য অভিনয় করতে থাকা রোবট দেখতে পেতেন।
এই বিষয়টিই পরে পার্কটির সঙ্গে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের মিল খুঁজে দেয়। সিরিজটি ছিল মাইকেল ক্রাইটনের ১৯৭৩ সালের চলচ্চিত্রের অভিযোজন। পার্কটি বন্ধ হওয়ার পর এই সাদৃশ্য আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বিশ শতকের শেষভাগে থিম পার্কের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েস্টার্ন ভিলেজও সমৃদ্ধি লাভ করে। বিশেষ করে টোকিও ডিজনিল্যান্ড, ইওমিউরিল্যান্ড এবং ফুজি-কিউ হাইল্যান্ডের মতো পার্কগুলোর উত্থান এই শিল্পকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
তবে নতুন সহস্রাব্দে পর্যটনের ধরন বদলে যায়। আধুনিক থিম পার্কগুলো আরও উন্নত অভিজ্ঞতা দিতে শুরু করে। অন্যদিকে ওয়েস্টার্ন ভিলেজের ব্যয়বহুল অ্যানিম্যাট্রনিক প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণের খরচও ছিল অনেক বেশি। দর্শনার্থীর সংখ্যা কমতে থাকায় পার্কটি চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি।
২০০৭ সালের নববর্ষের শুরুতেই পার্কটি কার্যত ইতিহাসে পরিণত হয়। প্রথমে সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হলেও পরে তা স্থায়ী হয়ে যায়। এরপর আর কোনো দর্শনার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে সেখানে প্রবেশ করেননি।
সাধারণত বিনোদন পার্ক বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত ভেঙে ফেলা হয় এবং জায়গাটি অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ওয়েস্টার্ন ভিলেজের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ধীরে ধীরে প্রকৃতি জায়গাটি পুনর্দখল করতে শুরু করে।
পাহাড়ি অঞ্চলে ভাঙচুর ও অপরাধ তুলনামূলক কম হওয়ায় পার্কটি এক অনন্য দৃশ্যপটে পরিণত হয়েছে। সময়ের মধ্যে আটকে থাকা খালি সেলুন, মরিচা ধরা কাঠামো আর নিশ্চুপ রোবট কাউবয়গুলো এক অদ্ভুত, রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে শহুরে অভিযাত্রী ও ফটোগ্রাফারদের কাছে এটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।
একসময় যা ছিল পারিবারিক বিনোদনের কেন্দ্র এবং জাপানের আমেরিকাপ্রীতির প্রতীক, আজ তা এক ধরনের অস্বস্তিকর অথচ আকর্ষণীয় স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
জাপানি কল্পনায় নির্মিত ‘আমেরিকান স্বপ্ন’-এর প্রতিরূপ আজ একটি ভূতুড়ে শহর। তবে মজার বিষয় হলো, স্বর্ণযুগের চেয়েও এখন হয়তো এটি বিশ্বজুড়ে বেশি পরিচিত।
নেকের মতে, এটি জাপানে আমেরিকার সাংস্কৃতিক প্রভাবের ধীরে ধীরে ক্ষয় হওয়ারও প্রতীক।