ঈদুল আজহার ছুটিতে সাধারণত পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের আধার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। তবে এবার ছিল ভিন্ন চিত্র। পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন পর তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ পেয়েছে বন ও এর বন্যপ্রাণী। বন সংশ্লিষ্টদের মতে, মানুষের ভিড় ও শব্দদূষণ কম থাকায় বিপন্ন উল্লুক, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী আরও স্বাভাবিক আচরণ করতে পেরেছে।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী ট্রেনের টিকিট সংকট, সড়কে যানজট এবং হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি মিলিয়ে এবার শ্রীমঙ্গলে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম পর্যটক এসেছেন। এতে পর্যটন খাত কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়লেও বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য পরিস্থিতি ইতিবাচক হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশকর্মী ও বনসংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ঈদের ছুটিতে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৭ হাজার ৫৮১ জন পর্যটক প্রবেশ করেছিলেন। অন্যদিকে চলতি বছরের ঈদুল আজহার ছুটিতে শনিবার পর্যন্ত দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৩৬ জন, যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
শ্রীমঙ্গল রেঞ্জের জুনিয়র স্কাউট তাজুল ইসলাম জানান, ঈদের ছুটিতে অন্য সময়ের মতো পর্যটকের চাপ দেখা যায়নি। ফলে উদ্যানে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ বজায় ছিল।
লাউয়াছড়া পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এবং লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য শামসুল হক বলেন, বড় ছুটিতে হাজার হাজার পর্যটকের উপস্থিতি বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত শব্দ, ভিড় এবং অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে প্রাণীরা খাবার সংগ্রহ কমিয়ে দেয়, স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রজনন আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তার ভাষায়, “এবার বনটি কিছুটা নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।”
জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এখানে বিপন্ন পশ্চিমা হুলক গিবন বা উল্লুক ছাড়াও শতাধিক প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাস রয়েছে।
প্রতি বছর ঈদ, শীতকালীন ছুটি এবং বিভিন্ন সরকারি ছুটিতে এই উদ্যানে পর্যটকের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পরিবেশবিদদের মতে, উচ্চস্বরে গান বাজানো, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে যাওয়া এবং নির্ধারিত পথের বাইরে বনের গভীরে প্রবেশের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে।
শামসুল হক বলেন, “পর্যটক ভালো উদ্দেশ্যে আসুক বা না আসুক, প্রাণীরা মানুষের উপস্থিতি, শব্দ ও অনুপ্রবেশই অনুভব করে।”
খাসিয়া সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রকাশনা সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, এবার উল্লুকের ডাক তুলনামূলক বেশি শোনা গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিকেও বনের সীমানার কাছাকাছি বেশি দেখা গেছে।
তার মতে, পর্যটক কম থাকলে শব্দদূষণ ও আবাসস্থলের ওপর চাপ কমে যায়। ফলে যেসব প্রাণী সাধারণত ভিড়ের সময় গভীর বনে সরে যায়, তারা তুলনামূলক স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করতে পারে।
পর্যটন খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
রাধানগর ট্যুরিজম এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস দাশ জানান, ঈদের আগেই এলাকার হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছিল। তবে অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেক পর্যটক রিসোর্টের ভেতরেই সময় কাটিয়েছেন এবং বাইরে ঘোরাঘুরি কম করেছেন।
পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ, যানজট এবং ট্রেনের টিকিট সংকট মিলিয়ে এবার পর্যটকের সংখ্যা কম ছিল।
তবে কম ভিড়ের কারণে সন্তুষ্ট ছিলেন অনেক দর্শনার্থীও।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগেরবার এত ভিড় ছিল যে প্রাণীগুলো চোখেই পড়ত না। এবার বনটাকে অনেক বেশি স্বাভাবিক মনে হয়েছে।”
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক চঞ্চল বড়ুয়া বলেন, “শান্ত পরিবেশে বন ঘোরার অভিজ্ঞতা অনেক ভালো ছিল। এতে প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করা যায়।”
নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের দাবি
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্ট্যান্ড ফর আওয়ার এনডেঞ্জার্ড ওয়াইল্ডলাইফের সহপ্রতিষ্ঠাতা সোহেল শ্যাম বলেন, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন দীর্ঘমেয়াদে বনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। তার মতে, লাউয়াছড়া মূলত বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। তাই পর্যটক প্রবেশে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির মৌলভীবাজার ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নুরুল মুহাইমিন মিল্টন বলেন, এবারের ঈদ প্রমাণ করেছে যে পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে লাউয়াছড়ার পরিবেশ দ্রুত পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা রাখে।
এদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশ জানায়, ঈদের পুরো ছুটিজুড়ে শ্রীমঙ্গলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন ছিল এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
শ্রীমঙ্গলের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জার কাজী নাজমুল হক বলেন, পর্যটকের চাপ কমাতে ইতোমধ্যে প্রবেশ টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটক নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চিন্তাভাবনা করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের ঈদ দেখিয়েছে যে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।