ইউরোপের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর ভিড়, কোলাহল আর অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের বাইরে এখনও কিছু জায়গা আছে, যেখানে প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতি প্রায় অবিকৃত অবস্থায় টিকে আছে। স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে দূরবর্তী দ্বীপ এল হিয়েরো তেমনই এক গন্তব্য। বিশাল রিসোর্ট, পর্যটকের ভিড় কিংবা ব্যস্ত নগরজীবনের ছাপ ছাড়াই এটি এখন ইউরোপের অন্যতম আকর্ষণীয় ‘গোপন পর্যটন গন্তব্য’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেনেরিফের ব্যস্ত উপকূল থেকে প্রতিদিন মাত্র একটি ফেরি এল হিয়েরোর উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় দ্বীপটিতে। ইতিহাসের পাতায়ও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ১৪৯২ সালে আমেরিকা অভিযানে রওনা হওয়ার আগে ক্রিস্টোফার কলম্বাস ইউরোপের শেষ ভূমি হিসেবে এই দ্বীপই দেখেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।

ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফে, লানজারোতে ও গ্রান ক্যানারিয়ায় প্রতি বছর লাখো পর্যটক ভ্রমণ করলেও এল হিয়েরো এখনও তুলনামূলকভাবে নিরিবিলি। ২০২৪ সালে টেনেরিফে ৬০ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক গেলেও এল হিয়েরোতে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪ হাজার ১০০।

প্রায় ১২ হাজার মানুষের বাস এই দ্বীপে। ‘এক হাজার আগ্নেয়গিরির দ্বীপ’ নামে পরিচিত এল হিয়েরোতে রয়েছে ৫০০টির বেশি উন্মুক্ত আগ্নেয়গিরির গহ্বর এবং অসংখ্য লাভা প্রবাহের চিহ্ন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়, মেঘে ঢাকা বনভূমি, কালো আগ্নেয় শিলা আর ফিরোজা রঙের সমুদ্র মিলিয়ে এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অনন্য।

মাত্র ১০০ বর্গমাইল আয়তনের দ্বীপটিতে একই সঙ্গে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতি। কোথাও ঘন বনভূমি, কোথাও আঙুরখেত ও কৃষিজমি, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ আগ্নেয় সমভূমি। পশ্চিমাঞ্চলের চারকো আজুলের মতো প্রাকৃতিক সুইমিং পুল স্থানীয় ও বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়।

কৃষি ও মদ উৎপাদন দ্বীপটির অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। গোলফো উপত্যকাজুড়ে রয়েছে ফলের বাগান ও আঙুরখেত। পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বর্তমানে কলা, আনারস, কফি, কোকো ও ড্রাগন ফলের চাষও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এল হিয়েরোর আরেকটি বিশেষ পরিচয় তার শতাব্দীপ্রাচীন আঙুরের জাত। উনিশ শতকে ইউরোপের বহু আঙুরখেত ধ্বংসকারী ফিলক্সেরা রোগের প্রভাব এখানে না পড়ায় বিরল অনেক জাত আজও সংরক্ষিত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মদ দ্বীপটির খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দক্ষিণ উপকূলের লা রেস্তিঙ্গা গ্রাম সামুদ্রিক খাদ্য ও ডাইভিংয়ের জন্য সুপরিচিত। এখানকার ‘মার দে লাস কালমাস’ সংরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চল স্বচ্ছ পানি, আগ্নেয়গিরির নিচের গঠন ও প্রবালপ্রাচীরের কারণে পশ্চিম ইউরোপের অন্যতম সেরা ডাইভিং স্পট হিসেবে বিবেচিত।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দ্বীপটির রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। ‘সিলবো এরেনিও’ নামে শিসভিত্তিক একটি প্রাচীন ভাষা একসময় দূরবর্তী যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়লেও বর্তমানে স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে এর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তবে পরিবেশ সংরক্ষণেই সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত এল হিয়েরো। বিশ্বের প্রথম শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর দ্বীপ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে এটি। জল ও বায়ুশক্তিভিত্তিক ‘গোরোনা দেল ভিয়েন্তো’ প্রকল্প দ্বীপটির বিদ্যুতের বড় অংশ সরবরাহ করে। ২০১৯ সালে টানা ২৪ দিনেরও বেশি সময় জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ সরবরাহ করে দ্বীপটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে।

বর্তমানে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে পর্যটন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আঙুরখেত ভ্রমণ, মাছ ধরার অভিজ্ঞতা, পনির তৈরির কর্মশালা, অ্যালোভেরা চাষ পরিদর্শন এবং প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এল হিয়েরোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর শান্ত, ধীর ও স্বতন্ত্র জীবনধারা, যা আধুনিক ব্যস্ত পৃথিবীতে ভ্রমণকারীদের জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা।