মেক্সিকোর জোচিমিলকোর খালপথের গভীরে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম অদ্ভুত পর্যটন আকর্ষণ—‘পুতুলের দ্বীপ’। স্থানীয়রা চেনেন ‘লা ইসলা দে লাস মুনিয়েকাস’ নামে।
দ্বীপটি এখন ভৌতিক পরিবেশের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এক নিঃসঙ্গ মানুষের সৃষ্টি করা এই দ্বীপ ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ‘ডার্ক ট্যুরিজমের’ অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের আকর্ষণীয় ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে অনেক বেশি দুঃখজনক ও জটিল এক গল্প, যা মানসিক স্বাস্থ্য, শোক এবং ট্র্যাজেডি নিয়ে ব্যবসা করা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলে।
যুক্তরাজ্যের ‘ফারআউট’ সাময়িকী লিখেছে, জোচিমিলকোর ইতিহাস অনেক পুরনো। স্প্যানিশরা মেক্সিকো দখলের বহু আগেই এখানকার খাল ও ভাসমান দ্বীপগুলোর সৃষ্টি হয়।
এসব কৃষিভিত্তিক ভাসমান দ্বীপ, যেগুলো ‘চিনাম্পাস’ নামে পরিচিত, একসময় অ্যাজটেকরা ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করত। কিন্তু বর্তমানে সেগুলো পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
আজ খালগুলো ভরে থাকে পর্যটকবাহী নৌকা, খাবারের দোকান এবং মারিয়াচি ব্যান্ডে। অনেকের মতে, এটি প্রকৃত মেক্সিকোর চেয়ে বরং পর্যটকদের আকৃষ্ট করে অর্থ উপার্জনের একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
তবে এই কোলাহল থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে পুতুলের দ্বীপ। এখানে সময় যেন থেমে যায়। নেই কোনো গান, নেই উৎসবের আমেজ। দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত ভাঙা, নষ্ট ও পচে যাওয়া পুতুল। কিছু ঝুলছে গাছের ডালে, কিছু পেরেক দিয়ে আটকানো দেয়ালে, আবার কিছু ঝুলছে পানির ওপর। বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়া ও সময়ের প্রভাবে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া এসব পুতুলের অনেকগুলোর চোখ, হাত বা পা নেই।
সবকিছুর শুরু হয় যখন ডন জুলিয়ান সান্তানা ব্যারেরা নামের এক ব্যক্তি দ্বীপটিতে বসবাস শুরু করেন। তার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। ধারণা করা হয়, গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পরিবার ছেড়ে জোচিমিলকোর খাল এলাকায় একা বসবাস শুরু করেন। কেউ তাকে ধর্মপ্রাণ মানুষ বলতেন, কেউ নির্জনবাসী, আবার কেউ মনে করতেন তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত ছিল—তিনি সম্পূর্ণ একা ছিলেন।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, একদিন তিনি খালে ডুবে মারা যাওয়া এক কিশোরীর মরদেহ খুঁজে পান। ঘটনাটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কয়েকদিন পর তিনি খালে ভাসতে থাকা একটি পুতুল দেখতে পান এবং বিশ্বাস করেন সেটি ওই মেয়েটির ছিল।
মেয়েটির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অথবা তার আত্মার ভয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তিনি পুতুলটি একটি গাছে ঝুলিয়ে দেন। পরে তিনি দাবি করেন, মেয়েটির আত্মা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি ফিসফিস শব্দ ও পায়ের আওয়াজ শুনতে পান। ফলে আরও পুতুল সংগ্রহ করে গাছে ঝোলাতে শুরু করেন।
দশকের পর দশক ধরে এটি এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়। ব্যারেরা আবর্জনার স্তূপ, খাল এবং বাজার থেকে পুরোনো ও ভাঙা পুতুল সংগ্রহ করতেন। সেগুলো দ্বীপজুড়ে ঝুলিয়ে রাখতেন। ধীরে ধীরে দ্বীপটি তার বর্তমান ভয়ঙ্কর চেহারা লাভ করে।
এরপর দ্বীপটি মানুষের নজর কাড়তে শুরু করে। ভৌতিক পরিবেশের কারণে পর্যটকরা সেখানে আসতেন, ছবি তুলতেন এবং ব্যারেরার গল্প শুনতেন। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, তিনি দ্বীপটিকে সত্যিই ভুতুড়ে মনে করতেন এবং পুতুলগুলোকে রক্ষাকবচ হিসেবে দেখতেন।
২০০১ সালে এই গল্প নতুন মোড় নেয়। ব্যারেরাকে মৃত অবস্থায় খালে পাওয়া যায়—ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন বহু বছর আগে মেয়েটির মরদেহ পেয়েছিলেন। তার মৃত্যুর কারণ কখনো স্পষ্ট হয়নি। কেউ বলেন, তিনি পানির দিকে ডেকে নেওয়া কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন। আবার কেউ মনে করেন, দুর্ঘটনাজনিত ডুবে যাওয়া বা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আরও গভীরে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, আদৌ কোনো মেয়ে ছিল কি না, সেটিই নিশ্চিত নয়। ব্যারেরার কিছু আত্মীয় মনে করেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। অন্যরা ধারণা করেন, এটি হয়তো তার কল্পনার অংশ ছিল অথবা কোনো পুরোনো ঘটনার অতিরঞ্জিত বর্ণনা।
তবে বাস্তব সত্য যাই হোক, তার মৃত্যুর পর দ্বীপটির জনপ্রিয়তা বিস্ফোরকভাবে বেড়ে যায়। এটি বিভিন্ন ভ্রমণ অনুষ্ঠান, ইউটিউব ভিডিও এবং ভূত অনুসন্ধানী দলের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অনেক দর্শনার্থী নিজেদের পুতুলও সেখানে রেখে আসেন।
আজ পুতুলের দ্বীপকে ঘিরে একটি বড় প্রশ্ন হলো—ট্র্যাজেডিকে কি পর্যটন পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে? দ্বীপটির পুরো আকর্ষণই মূলত একটি ভয়াবহ ঘটনার গল্পের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি মেয়েটির অস্তিত্ব নিয়ে রহস্যও পর্যটন বাজারে এর আবেদন বাড়িয়েছে।
মেক্সিকোর সংস্কৃতিতে মৃত্যু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লোককাহিনি ও ‘ডে অব দ্য ডেড’ উৎসবের মাধ্যমে তারা মৃত্যুকে অন্যভাবে দেখার ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে পুতুলের দ্বীপ দেশটির মৃত্যু ও আত্মা সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও হতে পারে।
তবে অধিকাংশ পর্যটকের কাছে এটি মূলত একটি ভৌতিক স্থান, যেখানে অদ্ভুত কিছু দেখা যায় এবং সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার মতো আকর্ষণীয় ছবি পাওয়া যায়।
সবশেষে বলা যায়, পুতুলের দ্বীপ পর্যটকদের কল্পনাকে বন্দি করেছে কারণ এটি একই সঙ্গে কিংবদন্তি, ট্র্যাজেডি, বাস্তবতা এবং ভিজ্যুয়াল আকর্ষণের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এটি একদিকে স্মৃতিস্তম্ভ, অন্যদিকে শিল্পকর্ম, ইনস্টাগ্রামের পটভূমি, ভৌতিক চলচ্চিত্রের সেট এবং একটি জীবন্ত কিংবদন্তি। আর হয়তো সবচেয়ে বড় কথা, এটি মানুষকে মৃত্যু এবং জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।