ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর শুধু একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, এটি দেশের সামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা এবং বিমান প্রযুক্তির বিবর্তনের এক অনন্য সংগ্রহশালা। যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, রাডার ও ঐতিহাসিক উড়োজাহাজের সমাহারে জাদুঘরটি এখন রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

জাদুঘরে প্রবেশের পরই চোখে পড়ে খোলা আকাশের নিচে সারিবদ্ধভাবে সাজানো যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম। বদ্ধ কক্ষের পরিবর্তে সবুজ প্রান্তরে গড়ে তোলা এই জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা তৈরি করে। বর্তমানে এখানে ১৯টি বিমান এবং ৩টি রাডার সংরক্ষিত রয়েছে।

জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহাসিক ডাকোটা বিমান। পাশাপাশি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী ‘অ্যালুয়েট’ হেলিকপ্টার, যা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা অবস্থানে আঘাত হানতে ব্যবহৃত হয়েছিল। দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে কিছু বিমান ও হেলিকপ্টারের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান।

প্রবেশমুখের কাছেই রয়েছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম পরিবহন উড়োজাহাজ রাশিয়ায় নির্মিত এন-২৪ ‘বলাকা’। ১৯৭৩ সালে বিমান বাহিনীতে যুক্ত হওয়া এই উড়োজাহাজে একসঙ্গে ৪৪ জন যাত্রী বহন করা যেত। বলাকাসহ কয়েকটি বিমানে দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেন। এসব বিমানের ভেতরে বিমান বাহিনীর ইতিহাস ও কার্যক্রম নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।

জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান। এর মধ্যে রয়েছে হান্টার বিমান, যা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছিল। রয়েছে চীনে নির্মিত এফটি-৭ যুদ্ধবিমান, মিগ-২১ এফএল এবং ন্যাট-৯১৬। বিশেষ করে ন্যাট-৯১৬ বিমানটি আকাশযুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতার জন্য পরিচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাট বিমান পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অটার-৭২১ বিমানও এখানে সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরের প্রতিটি নিদর্শনের পাশে বিস্তারিত তথ্য সংযুক্ত থাকায় দর্শনার্থীরা সহজেই সংশ্লিষ্ট ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন।

শুধু বিমান প্রদর্শনীই নয়, দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে শহিদ কর্নার, যেখানে মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর শহিদ সদস্যদের স্মরণ করা হয়েছে। শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’, যেখানে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে ফুড কোর্ট, স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’, পানির ফোয়ারা এবং বিনোদনমূলক বিভিন্ন আয়োজন।

বিমান বাহিনী জাদুঘর সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার ও শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা। এছাড়া ৩০ থেকে ১০০ টাকার টিকিটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিমান ও হেলিকপ্টারে ওঠার সুযোগ পাওয়া যায়।

রাজধানীর যেকোনো স্থান থেকে সহজেই আগারগাঁও পৌঁছে জাদুঘরে যাওয়া যায়। গুলিস্তান, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস সার্ভিস রয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি বা সিএনজিতেও সহজে পৌঁছানো সম্ভব।

ইতিহাস, প্রযুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি একসঙ্গে দেখতে চাইলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ গন্তব্য।