দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন ক্লাউড ফরেস্টের গভীরে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়কর শহর—মাচু পিচু। ইনকা সম্রাটদের হাতে নির্মিত এই প্রাচীন নগরী ছিল একসময় পবিত্র ও রহস্যময় আশ্রয়স্থল, যা বহির্বিশ্বের কোলাহল থেকে দূরে রাখতেই চেয়েছিলেন তারা। শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই নির্জনতা অটুট থাকলেও আধুনিক বিশ্বের পর্যটনের ঢেউ এখন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

আজও মাচু পিচু পৌঁছানো সহজ নয়। পর্যটকদের লিমা থেকে কুসকো, সেখান থেকে দীর্ঘ ট্রেন ও বাসযাত্রা পাড়ি দিতে হয়। অনেকের কাছে এই ভ্রমণ রোমাঞ্চকর হলেও বেশ কষ্টসাধ্য। এই যাতায়াত সহজ করতে পেরু সরকার নির্মাণ করছে ‘চিঞ্চেরো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। সরকারের ভাষ্য, এই প্রকল্প চালু হলে পর্যটন শিল্পে গতি আসবে, তৈরি হবে প্রায় ৫,০০০ নতুন কর্মসংস্থান এবং উপকৃত হবে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ।

কিন্তু উন্নয়নের এই উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর উদ্বেগ। চিঞ্চেরোর উপকণ্ঠে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিমানবন্দরটি সরাসরি পর্যটকদের ইনকা সভ্যতার কেন্দ্রে পৌঁছে দেবে। ফলে পর্যটকের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে আশপাশের অঞ্চলে পরিবেশগত চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

উরকুইলোস, যাকে বিশ্বের ভুট্টার রাজধানী বলা হয়, সেই অঞ্চলের প্রাচীন কৃষিজমি দ্রুত আবাসন প্রকল্পে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় গাইড লুইস ফ্লোরেসের ভাষায়, যেখানে শত শত বছর ধরে আলু ও ভুট্টা চাষ হতো, সেখানে এখন কংক্রিটের দালান দাঁড়াচ্ছে। বিমানবন্দর চালুর আগেই জলাশয় ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পানির সংকট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ।

গাইড লিজবেথ লোপেজ সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামাল দেওয়ার মতো অবকাঠামো এই অঞ্চলের নেই। ইউনেস্কোও ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে—অব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে মাচু পিচু তার ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ মর্যাদা হারাতে পারে। অন্যদিকে হোটেল ব্যবসায়ী পেতিত মিরিবল মনে করেন, বিমানবন্দর চালু হোক বা না হোক, প্রকৃতির যে ক্ষতি হয়েছে তা ইতিমধ্যেই গভীর।

এই পরিস্থিতিতে মাচু পিচু এক প্রতীকী দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে—উন্নয়ন বনাম ঐতিহ্য। একদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থানের আশা, অন্যদিকে প্রাচীন ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন। ইতিহাসের এই নীরব সাক্ষী কি তার গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি পর্যটনের চাপে হারিয়ে যাবে ইনকাদের পবিত্র ভূমি? উত্তরটি এখন সময়ের হাতেই ন্যস্ত।