বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প উল্লেখযোগ্য ধাক্কার মুখে পড়েছে; রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা এর প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ—ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ, যেখানে তাদের পর্যটন খাতকে শক্তিশালী করতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে এবং এই খাত থেকে দেশের জিডিপিতে খুব সামান্য অবদান আসছে।
পর্যটনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ট্র্যাভেল অ্যান্ড টুর ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদন বলছে
চলমান নিরাপত্তা উদ্বেগ, বৈচিত্র্যময় আকর্ষণের অভাব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ঘাটতি বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ন করছে। ফলে বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাতে উত্থান ঘটলেও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার দেখা যায়নি; বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব সমস্যা সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: প্রবৃদ্ধির প্রধান বাধা
বাংলাদেশে পর্যটন খাতের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। ঘনঘন রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও সহিংস সংঘর্ষ পর্যটকদের মধ্যে অনিরাপত্তার অনুভূতি সৃষ্টি করে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিরতা সামনে রেখে পর্যটন খাত আরেকটি কঠিন বছরের আশঙ্কা করছে। বড় শহরগুলোতে রাজনৈতিক সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা, আর জনসমাবেশ ও আন্দোলনের কারণে পরিবহন ব্যবস্থাও প্রায়ই ব্যাহত হয়—যা ভ্রমণকারীদের নিরুৎসাহিত করে।
এই অস্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্র গোষ্ঠীর হামলায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থান ও অনুষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা। এসব ঘটনা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এবং দেশি-বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিদেশি গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নেতিবাচক উপস্থাপনাও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
পর্যটন অবকাঠামো ও পরিকল্পনার ঘাটতি
আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে পারেনি। ভারত, নেপাল বা শ্রীলঙ্কা যেখানে তাদের বৈচিত্র্যময় আকর্ষণকে কাজে লাগিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের পর্যটন মূলত সমুদ্রসৈকত ও পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার বড় আকর্ষণ হওয়ার কথা থাকলেও রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট ও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে এর সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশি-বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করার মতো একটি সমন্বিত পর্যটন কৌশল বাংলাদেশের নেই। আকর্ষণের বৈচিত্র্য কম এবং জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে পুনরায় ভ্রমণের আগ্রহও সীমিত। বিপরীতে বালি বা পাতায়ার মতো স্থানে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও উন্নত অবকাঠামো বারবার পর্যটক টানে।
দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলক অবস্থান
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পর্যটন খাতের পারফরম্যান্স অনেক দুর্বল। ২০২৪ সালে ভারত পর্যটন থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, আর নেপালের পর্যটন খাত গত বছরে ৩২% বৃদ্ধি পেয়ে জাতীয় জিডিপির ৬%-এর বেশি অবদান রেখেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে পর্যটন থেকে মাত্র ৪৪০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম।
মালদ্বীপে ২০২৪ সালে ১৫ লাখের বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছে এবং দেশটির জিডিপির ৬৮% এসেছে পর্যটন থেকে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কাও পর্যটক বাড়িয়ে আয় পুনরুদ্ধার করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান এখনও প্রায় ৩%, যা অঞ্চলটির মধ্যে অন্যতম কম।
পর্যটন শিল্পের চ্যালেঞ্জ
গ্রাহক সন্তুষ্টির অভাবও বাংলাদেশের পর্যটন খাতের বড় সমস্যা। পর্যটকেরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে আবাসন ও খাবারের মতো মৌলিক সেবার দাম অস্বাভাবিক বেশি এবং সিন্ডিকেটনিয়ন্ত্রিত, যা ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে বিরূপ করে। একই সঙ্গে নগর পর্যটনের সম্ভাবনাও অনেকটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। দিল্লি, ব্যাংকক বা টোকিওর মতো শহরের তুলনায় ঢাকার যানজট ও অপরিকল্পিত নগরায়ন পর্যটকদের জন্য কম আকর্ষণীয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামো বিনিয়োগ ছাড়া নগর পর্যটন বড় গন্তব্যে পরিণত হওয়া কঠিন। পর্যটকবান্ধব সেবার অভাব এবং প্রধান আকর্ষণগুলোর বিশৃঙ্খল অবস্থা সম্ভাব্য ভ্রমণকারীদের দূরে ঠেলে দেয়।
পুনরুদ্ধারের কৌশল
পর্যটন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। প্রথমত, পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা আরও জোরালোভাবে প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি পরিবহন, হোটেল ও বিনোদন সুবিধাসহ একটি সমন্বিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে, বাংলাদেশকেও প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে তেমন উদ্যোগ নিতে হবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সামনে পুনরুদ্ধারের পথ দীর্ঘ হলেও সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত অবকাঠামো ও বৈচিত্র্যময় আকর্ষণ গড়ে তোলা গেলে পতনশীল ধারা বদলানো সম্ভব। তবে নিরাপত্তা, মূল্যনিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামোগত মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়েই থাকবে।