হবিগঞ্জের বানিয়াচং শুধু দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম হিসেবে পরিচিত নয়, ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এটি একই সঙ্গে জলাবন, হাওর, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও লোকগাথার এক অনন্য গন্তব্য। গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় রয়েছে লক্ষ্মীবাঁওড়ের মিঠাপানির জলাবন, দেওয়ান রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ এবং প্রায় ৬৬ একরজুড়ে বিস্তৃত কমলা রানির দিঘি। বর্ষায় নৌপথে আর শুষ্ক মৌসুমে সড়কপথে এসব স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।
নৌপথে লক্ষ্মীবাঁওড়
হবিগঞ্জের আউশকান্দি থেকে নবীগঞ্জ হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বানিয়াচং বড় বাজারে পৌঁছানো যায়। স্থানীয়রা জায়গাটিকে ‘বাইন্নাচং’ নামেও ডাকেন। সেখান থেকে অটোরিকশায় আদর্শ বাজারের নৌঘাটে গিয়ে নৌকা ভাড়া করে যাত্রা শুরু করা যায় লক্ষ্মীবাঁওড়ের দিকে।
খড়তি নদের দক্ষিণে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক জলাবন স্থানীয়দের কাছে ‘খড়তির জঙ্গল’ নামেও পরিচিত। বর্ষায় পানির নিচে ডুবে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। তখন নৌকায় করেই জলাবনের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়।
জলাবনের পানিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে হিজল ও করচগাছ। চারপাশে শাপলা, কচুরিপানা ও নানা জলজ উদ্ভিদ। পানির ওপর ভেসে থাকা পাতিহাঁস, জেলেদের মাচাঘর এবং জলঘেরা গ্রামগুলো হাওরের জীবনের সঙ্গে পর্যটককে পরিচয় করিয়ে দেয়।
লক্ষ্মীবাঁওড়ের পানিপথে ঘুরে আসতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে জলাবনের ভেতরের পিচঢালা পথে মোটরসাইকেল বা অটোরিকশায় যাতায়াত করা যায়।
ইতিহাসের সাক্ষী রাজবাড়ি
জলাবন থেকে ফিরে দেখা যায় দেওয়ান রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ সিংহ ওরফে হাবিব খান এই রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। প্রাসাদের পুরোনো দেয়াল, বটগাছের শিকড়, সালিস ঘর এবং পাশের দেওয়ানদিঘি এখনও অতীতের স্মৃতি বহন করছে।
শুক্র ও শনিবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজবাড়ি বিনা টিকিটে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
কমলা রানির দিঘি
বানিয়াচংয়ের আরেক উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ কমলা রানির দিঘি, স্থানীয়দের কাছে ‘সাগর দিঘি’ নামেও পরিচিত। প্রায় ৬৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই দিঘিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দিঘি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সামন্ত রাজা পদ্মনাভ প্রজাদের পানির সংকট দূর করতে দিঘিটি খনন করেছিলেন বলে প্রচলিত। দিঘিকে ঘিরে রয়েছে রানি কমলাবতীর আত্মত্যাগের লোকগাথা। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও এই দিঘির পাড়ে বসে ‘রাণী কমলাবতীর দিঘি’ কবিতা লিখেছিলেন, যা তাঁর ‘সূচয়নী’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত।
কখন যাবেন, কোথায় থাকবেন
বর্ষায় লক্ষ্মীবাঁওড়ের জলাবন নৌকায় ঘুরে দেখার উপযোগী। শুষ্ক মৌসুমে পানির নিচে থাকা পথ ধরে জলাবনের ভিন্ন রূপ দেখা যায়। রাজবাড়ি দেখতে শুক্র ও শনিবার বিকেল সবচেয়ে সুবিধাজনক।
বানিয়াচংয়ে খাবারের দোকান থাকলেও আবাসিক হোটেলের সুবিধা সীমিত। তাই দিনভর ঘোরাঘুরি শেষে থাকার জন্য হবিগঞ্জ শহরে ফিরে যাওয়া সুবিধাজনক। ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে বাসে হবিগঞ্জ যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে নেমে সড়কপথে হবিগঞ্জ হয়ে বানিয়াচং যেতে হবে।