ভারতের রাজস্থান মানেই মরুভূমি, রাজপ্রাসাদ আর ঐতিহাসিক দুর্গ। তবে রাজ্যের আরাবল্লি পর্বতমালার দুর্গম পাহাড়ে রয়েছে এমন এক দুর্গ, যার প্রতিরক্ষা প্রাচীর প্রায় ৩৬ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। বিশাল এই প্রাচীরের কারণেই কুম্ভলগড় দুর্গ পরিচিতি পেয়েছে ভারতের ‘গ্রেট ওয়াল’ নামে। ইতিহাস, স্থাপত্য ও পাহাড়ি ভূদৃশ্যের অনন্য সমন্বয়ের কারণে দুর্গটি এখন রাজস্থানের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনস্থল।

পাহাড়জুড়ে ৩৬ কিলোমিটারের প্রাচীর

কুম্ভলগড়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর দীর্ঘ পাথরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর। রাজস্থান পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীরটি প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং কিছু অংশে এতটাই প্রশস্ত যে পাশাপাশি আটটি ঘোড়া চলতে পারে।

প্রাচীরটি সরল রেখায় নির্মাণ করা হয়নি। আরাবল্লি পর্বতমালার স্বাভাবিক ঢাল, উঁচু-নিচু ভূমি ও পাহাড়ের আকৃতি অনুসরণ করে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে অনেক জায়গায় প্রাচীরটি পাহাড়ের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে দূর থেকে এটি ভূপ্রকৃতিরই অংশ বলে মনে হয়।

‘ভারতের গ্রেট ওয়াল’ নামটি মূলত প্রাচীরটির বিশাল আকার ও প্রতিরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্য বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। চীনের মহাপ্রাচীরের সঙ্গে কুম্ভলগড়ের সরাসরি ঐতিহাসিক বা স্থাপত্যগত সম্পর্ক নেই।

১১০০ মিটার উচ্চতায় ঐতিহাসিক দুর্গ

মেওয়ারের শাসক রানা কুম্ভের আমলে ১৪৪৩ থেকে ১৪৫৮ সালের মধ্যে কুম্ভলগড় দুর্গ নির্মিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১০০ মিটার উচ্চতায় আরাবল্লির দুর্গম ভূখণ্ডে এর অবস্থান।

দুর্গে প্রবেশের পথও ছিল প্রতিরক্ষাকেন্দ্রিক। একাধিক প্রবেশদ্বার, প্রাচীর ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করে মূল দুর্গে পৌঁছাতে হতো। প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় সাতটি বড় প্রবেশদ্বারের উল্লেখ রয়েছে।

দুর্গের ভেতরে ছিল রাজপ্রাসাদ, মন্দির, আস্তাবলসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এসব অবকাঠামো দীর্ঘ সময় দুর্গের ভেতরে অবস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছিল। রানা কুম্ভের রাজদরবারের স্থপতি হিসেবে পরিচিত মান্দানের নামও কুম্ভলগড়ের স্থাপত্য পরিকল্পনার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।

একসময় দখল হয়েছিল দুর্গ

দুর্গটি অত্যন্ত সুরক্ষিত হলেও পুরোপুরি অজেয় ছিল না। ঐতিহাসিক নথিতে ১৫৭৮ সালে আকবরের বাহিনীর হাতে কুম্ভলগড় সাময়িকভাবে দখল হওয়ার উল্লেখ রয়েছে। রাজস্থান পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় দুর্গের প্রতিরক্ষাকারীরা পানীয় জলের সংকটে পড়েছিলেন।

এই ঘটনা দেখায়, পাহাড় ও বিশাল প্রাচীরের পাশাপাশি দুর্গের ভেতরের পানি ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবস্থাপনাও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ

বর্তমানে কুম্ভলগড় রাজস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি। এটি রাজস্থানের ছয়টি ঐতিহাসিক পাহাড়ি দুর্গের সমষ্টি ‘হিল ফোর্টস অব রাজস্থান’-এর অংশ। ২০১৩ সালে এই দুর্গসমষ্টি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

দুর্গের প্রাচীর ধরে হাঁটলে একদিকে দেখা যায় আরাবল্লির বিস্তৃত পাহাড়ি দৃশ্য, অন্যদিকে চোখে পড়ে শতাব্দীপ্রাচীন পাথরের স্থাপত্য। ইতিহাস ও প্রকৃতিকে একই ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় দেখতে চান এমন পর্যটকদের জন্য কুম্ভলগড় তাই রাজস্থানের উল্লেখযোগ্য গন্তব্য।