‘একটি শহর কখনোই প্রকৃত শহর হতে পারে না যদি সেখানে একটি বইয়ের দোকান না থাকে।’ কথাটি লেখক নীল গেইম্যান তার ২০০১ সালের উপন্যাস আমেরিকান গডসে লিখেছিলেন।
আজকের দিনে কথাগুলো কিছুটা সেকেলে শোনাতে পারে। অডিওবুক, ই-রিডার, কিন্ডল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানের যুগে মনে হতে পারে বইয়ের দোকান বুঝি অতীতের বিষয়।
কিন্তু বই-অনুপ্রাণিত ভ্রমণের জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক মাধ্যমে ‘বুকটক’-এর প্রভাবে বই বিক্রি বাড়তে থাকায় স্পষ্ট—পাঠাভ্যাস মোটেও হারিয়ে যায়নি।
নতুন কোনো দেশ বা শহরে ভ্রমণের সময় বইয়ের দোকান ঘোরা হয়তো আপনার অগ্রাধিকারের তালিকার শীর্ষে থাকে না। কিন্তু তাহলে আপনি অনেক কিছুই মিস করবেন।
বিশ্বজুড়ে এই সাহিত্যিক আকর্ষণস্থলগুলো শুধু বইপ্রেমীদের জন্য আরামদায়ক আশ্রয়ই নয়, বরং স্থানীয় সমাজের রুচি ও আগ্রহেরও এক বাস্তব প্রতিফলন।
অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো একটি শহরের গর্ব, অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত, এমন সব বিশ্বমানের ভবনে অবস্থিত যা বড় বড় পর্যটন আকর্ষণের সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারে।
৫ মার্চ বিশ্ব বই দিবস উপলক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, নান্দনিক ও অভিনব বইয়ের দোকানগুলোর দিকে নজর দেওয়ার উপযুক্ত সময়।
এখানে তুলে ধরা হলো বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর পাঁচটি বইয়ের দোকানের গাইড—

The interior of the store, showing skylight, staircase and book shelves

লিভরারিয়া লেলো, পোর্তো, পর্তুগাল
লিভরারিয়া লেলো অ্যান্ড ইরমাঁও, যা ইংরেজিতে লেলো বুকশপ নামে পরিচিত, অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন এক ভবনে। এর অলংকৃত সিঁড়ি, রঙিন কাঁচের জানালা এবং সোনালি ছাদ বিশ্বজুড়ে খ্যাত।
১৯০৬ সালে নির্মিত এই বইয়ের দোকানটি অনন্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। পাশাপাশি এখানে মূল্যবান রত্ন থেকে শুরু করে বিরল ও বিলাসবহুল বই পর্যন্ত নানা প্রদর্শনীও আয়োজন করা হয়।
প্রায়ই একে “বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বইয়ের দোকান” বলা হয়। সম্প্রতি এটি পর্তুগালের একটি স্বীকৃত জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা পেয়েছে এবং সংরক্ষণ কাজের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে।

The barge on the River Lea at Hackney Wick, in 2015

ওয়ার্ড অন দ্য ওয়াটার, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
অনেক পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেন ‘ওয়ার্ড অন দ্য ওয়াটার’। এই ব্যতিক্রমী বইয়ের দোকানের বিশেষত্ব হলো, এটি একটি নৌকায় অবস্থিত।
লন্ডন বুকবার্জ নামেও পরিচিত এই দোকানটি সাধারণত লন্ডনের কিংস ক্রস এলাকার গ্রানারি স্কয়ারে রিজেন্টস ক্যানালে ভাসমান অবস্থায় দেখা যায়।
গ্রীষ্মকালে বাইরে থেকেও বই দেখা যায়, তবে ভেতরে উঁকি দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। মনোরম সজ্জায় সাজানো এটি নিঃসন্দেহে লন্ডনের সবচেয়ে আরামদায়ক কোণগুলোর একটি।

undefined


কার্তুরেস্তি কারুসেল, বুখারেস্ট, রোমানিয়া
রোমানিয়ার বুখারেস্ট শহরকে অনেকে ব্যাচেলর পার্টি ও পার্টি-ভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে চেনেন। কিন্তু এখানেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম চমৎকার বইয়ের দোকান।
এর লক্ষ্য? পড়াকে আবার ‘কুল’ করে তোলা। এখানে আছে অতিথিদের মিলিত হওয়ার আমন্ত্রণমূলক পরিবেশ, বইয়ের প্রদর্শনী, সুগন্ধি চা, সঙ্গীত, বই প্রকাশ অনুষ্ঠান ও নানা প্রদর্শনী।
একজন ট্রিপঅ্যাডভাইজর ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘কার্তুরেস্তি কারুসেলে ঢোকা মানে যেন গল্পের বইয়ের ভেতরে প্রবেশ করা। সাদা সর্পিল সিঁড়ি, খোলা বারান্দা আর নরম আলো, এটি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর বইয়ের দোকানগুলোর একটি।
এটি শুধু দোকান নয়, একটি অভিজ্ঞতা। অসংখ্য বই, সঙ্গীত ও উপহারের তাক ঘুরে দেখার পর ওপরতলার ক্যাফেতে বসে পুরো জাদুকরী পরিবেশ উপভোগ করা যায়। এখানে সময় যেন ধীরে চলে। বুখারেস্টে অবশ্যই দেখার মতো জায়গা!”

undefined
শেক্সপিয়র অ্যান্ড কো., প্যারিস, ফ্রান্স
প্যারিসে শেক্সপিয়র অ্যান্ড কো. ভিজিট করলে দরজার বাইরে উত্তেজিত পর্যটকদের লম্বা লাইন দেখা অস্বাভাবিক নয়। ফরাসি রাজধানীর এই বিখ্যাত ইংরেজি বইয়ের দোকানের ভেতরে ঢোকার জন্যই সবার এই আগ্রহ।
নটর-ডাম ক্যাথেড্রালের কাছেই অবস্থিত এই স্বাধীন বইয়ের দোকানটি বহুদিন ধরে ইংরেজিভাষী পাঠক ও লেখকদের মিলনস্থল, যে শহর নিজেই পাঠক ও লেখকে পরিপূর্ণ।
এখানে গেলে সংযুক্ত ক্যাফেতে ঢুঁ মেরে মিষ্টি কিছু খেতে ভুলবেন না।

undefined

এল আতেনেও গ্র্যান্ড স্প্লেন্ডিড, বুয়েনোস আইরেস, আর্জেন্টিনা

আরও দূরে, আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেসে অবস্থিত এল আতেনেও গ্র্যান্ড স্প্লেন্ডিড বইয়ের দোকানটি দেখতে অনেকটা কনসার্ট হলের মতো।
কারণ, এটি আগে সত্যিই একটি থিয়েটার/সিনেমা হল ছিল, গ্রান স্প্লেন্ডিড থিয়েটার। বর্তমানে এখানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বই রয়েছে।
পুরোনো মঞ্চের ওপর এখন একটি বার রয়েছে, যেখানে অনন্য পরিবেশে কফি উপভোগ করা যায়।

একজন ট্রিপঅ্যাডভাইজর ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘আপনি যদি বুয়েনোস আইরেসে যান, তবে এল আতেনেও গ্র্যান্ড স্প্লেন্ডিডে অবশ্যই থামবেন। আমি পড়াশোনার জন্য আট সপ্তাহ এই শহরে ছিলাম, আর নিঃসন্দেহে এটি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর বইয়ের দোকান। এটি একটি সাবেক থিয়েটার, যা বইয়ের দোকানে রূপান্তর করা হয়েছে, তাই এখনো রয়েছে মূল ফ্রেস্কো আঁকা ছাদ, অলংকৃত খোদাই আর মখমলের পর্দা।’