ইউরোপের দেশ ক্রোয়েশিয়া প্রকৃতির বৈচিত্র্য আর সংরক্ষিত বনভূমির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের নীল জলরাশি থেকে শুরু করে ডিনারিক আল্পসের পাহাড়ি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত এই দেশের ভূপ্রকৃতি যেন এক বিশাল প্রাকৃতিক গ্যালারি। দেশজুড়ে রয়েছে আটটি জাতীয় উদ্যান, যেখানে জলপ্রপাত, হ্রদ, দ্বীপ, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ।

ফটোগ্রাফারদের জন্য জলপ্রপাত, পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ কিংবা প্রকৃতির নীরবতায় সময় কাটানোর সুযোগ—সবই পাওয়া যায় এসব উদ্যানে। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে তাই ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় উদ্যানগুলো বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

১. ক্রকা জাতীয় উদ্যান

ক্রোয়েশিয়ার অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক অঞ্চল ক্রকা জাতীয় উদ্যান। ক্রকা নদীর নামেই এই উদ্যানের নামকরণ। ডালমাটিয়া অঞ্চলের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যান।

এখানে রয়েছে মোট ১৬টি জলপ্রপাত। এর মধ্যে ইউরোপের অন্যতম বড় ট্র্যাভারটাইন জলপ্রপাতও রয়েছে। সাতটি জলপ্রপাতের একটি বিশেষ অংশ পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর মধ্যে পোস্টকার্ডের মতো সুন্দর স্ক্রাডিনস্কি বুক জলপ্রপাত সবচেয়ে পরিচিত। পাশাপাশি রোশকি স্লাপ জলপ্রপাতও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে।

ক্রকা নদীর মাঝখানে একটি ছোট দ্বীপে অবস্থিত ভিসোভাচ মঠ এই উদ্যানের আরেকটি আকর্ষণ। মধ্যযুগে প্রতিষ্ঠিত ক্রকা মঠও দর্শনার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান।

নিকটবর্তী শিবেনিক শহর থেকে এই উদ্যানে নিয়মিত ভ্রমণ ট্যুর পরিচালিত হয়।

২. প্লিটভিস হ্রদ জাতীয় উদ্যান

ক্রোয়েশিয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় জাতীয় উদ্যান হলো প্লিটভিস হ্রদ জাতীয় উদ্যান। দেশের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত এই পার্কে রয়েছে ১৬টি ধাপে সাজানো হ্রদের এক অনন্য ব্যবস্থা।

প্রাকৃতিকভাবে তৈরি টুফা বাধার কারণে এখানে অসংখ্য ছোট নদী, পুকুর এবং প্রায় ৯০টির বেশি জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য।

স্বচ্ছ হ্রদ, সবুজ তৃণভূমি এবং ঘন বনভূমির কারণে এই উদ্যান বহু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। এখানে লিংক্স, বাদামি ভালুক এবং ধূসর নেকড়ের মতো প্রাণী দেখা যায়।

রাজধানী জাগরেব থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা এবং স্প্লিট শহর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই উদ্যান। বিভিন্ন শহর থেকে এখানে গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থাও রয়েছে।

৩. ম্লিয়েত জাতীয় উদ্যান

অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে অবস্থিত ম্লিয়েত দ্বীপের প্রায় এক তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ম্লিয়েত জাতীয় উদ্যান। ডুব্রোভনিক উপকূল থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শান্ত দ্বীপে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল নেই।

এখানে রয়েছে দুটি লবণাক্ত হ্রদ—ভেলিকো ইয়েজেরো এবং মালো ইয়েজেরো। বড় হ্রদের মাঝখানে ছোট একটি দ্বীপে রয়েছে ১২শ শতকের একটি বেনেডিক্টাইন মঠ, যা দর্শনার্থীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।

উদ্যানজুড়ে রয়েছে সাইক্লিং ট্রেইল ও হাঁটার পথ। এর মধ্যে পোমেনা ট্রেইল একটি জনপ্রিয় পথ, যেখানে বনভূমি ও উপসাগরের পাশ দিয়ে দীর্ঘ হাঁটার সুযোগ রয়েছে।

৪. ব্রিজুনি জাতীয় উদ্যান

ইস্ট্রিয়া অঞ্চলের উপকূলে অবস্থিত ব্রিজুনি জাতীয় উদ্যান মূলত ১৪টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। প্রায় ১৮৩৮ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যান ঘুরে দেখার সবচেয়ে ভালো উপায় নৌকা বা ফেরি ভ্রমণ।

এখানে একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো ডাইনোসরের ২০০টিরও বেশি পদচিহ্ন, যা কেপ ভারবান ও কেপ প্লোচে এলাকায় পাওয়া গেছে।

সবুজ তৃণভূমি, প্রাচীন স্থাপনা এবং একটি সাফারি পার্ক এই উদ্যানকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সাফারি পার্কে জেব্রা, হাতি ও ময়ূরের মতো প্রাণীও দেখা যায়।

ইস্ট্রিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের ছোট শহর ফাজানা থেকে এই উদ্যানে যাওয়ার টিকিট ও নৌযাত্রার ব্যবস্থা রয়েছে।