জাপানে ছোট ছোট আচরণও বড় গুরুত্ব পায়। বাটি কীভাবে ধরবেন, চপস্টিক কোথায় রাখবেন, আবর্জনা কীভাবে ফেলবেন— এসব সূক্ষ্ম বিষয়েই ধরা পড়ে আপনি কেমন অতিথি।

প্রাচীন মন্দির আর ভবিষ্যতধর্মী নগরীর টানে অনেকেই প্রথমবার জাপানে যান, কিন্তু ফিরে এসে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হন ঝকঝকে রাস্তা, সময়নিষ্ঠ ট্রেন আর পরিপাটি খাবারের অভিজ্ঞতায়। 
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে এই শৃঙ্খলার পেছনে আছে বহু অলিখিত সামাজিক নিয়ম।
১. চপস্টিক ও বাটির শিষ্টাচার
জাপানে চপস্টিকই প্রধান খাবার উপকরণ। ভাতের মধ্যে চপস্টিক খাড়া করে গেঁথে রাখা বা এক জোড়া চপস্টিক থেকে আরেক জোড়ায় খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ। এগুলো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচারকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ব্যবহার না করলে চপস্টিক রাখুন নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে বা বাটির ওপর আড়াআড়ি করে। স্যুপ বা ভাত খাওয়ার সময় বাটি মুখের কাছে তুলে নেওয়াই ভদ্রতা; ঝুঁকে খাওয়া অশোভন।
২. শব্দ করে নুডলস খাওয়া দোষ নয়
রামেন বা উডনের মতো স্যুপ-নুডলস খেতে শব্দ করা পশ্চিমে অশোভন মনে হলেও জাপানে তা স্বাভাবিক। বিশ্বাস করা হয়, এতে সুগন্ধ বাড়ে এবং গরম নুডলস ঠান্ডা হয়।
৩. রেস্তোরাঁর ভাষা
খাবারের দোকানে ঢুকে কর্মীরা জোরে বলবে, ‘ইরাশাইমাস’, মানে স্বাগতম। জবাব দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়; হাসিমুখে মাথা নাড়লেই যথেষ্ট। ওয়েটারের দৃষ্টি আকর্ষণে বলুন ‘সুমিমাসেন’ (মাফ করবেন)। খাবারের আগে ‘ইতাদাকিমাসু, শেষে ‘গোচিসোসামা, মানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।


৪. টিপস নয়, ভদ্রতা দিন
জাপান কঠোরভাবে ‘নো-টিপিং’ সংস্কৃতি মেনে চলে। অতিরিক্ত অর্থ রেখে এলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ভালো সেবাকে কাজের অংশ হিসেবেই দেখা হয়। খাবার প্লেট পরিষ্কার করে শেষ করাই শোভন; বেঁচে যাওয়া খাবার সাধারণত বাড়ি নেওয়া হয় না।
৫. নীরব গণপরিবহন
দ্রুতগতির ট্রেন নেটওয়ার্কের জন্য বিখ্যাত জাপান। তবে ট্রেন বা বাসে ফোনে জোরে কথা বলা নিরুৎসাহিত। মোবাইল সাইলেন্টে রাখুন, হেডফোন ব্যবহার করুন। কল ধরতে হলে নেমে নিন।
৬. পথে হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া এড়িয়ে চলুন
রাস্তায় বা গণপরিবহনে হাঁটতে হাঁটতে খাওয়া পছন্দ করা হয় না। খাবার কিনলে দোকানের কাছেই খান বা বেঞ্চে বসুন। তবে দূরপাল্লার ট্রেন, বিশেষত শিনকাসেনে বেন্টো খাওয়া স্বাভাবিক।


৭. নিজের আবর্জনা নিজেই সামলান
রাস্তা পরিষ্কার, কিন্তু ডাস্টবিন বিরল। ধারণা হলো, নিজের ময়লা নিজেই ঘরে নিয়ে ফেলবেন। প্রয়োজনে কনভিনিয়েন্স স্টোর, রেলস্টেশন বা ভেন্ডিং মেশিনের পাশে ডাস্টবিন পাবেন।
৮. অনসেনের নিয়ম জানুন
জাপানের ঐতিহ্যবাহী উষ্ণ প্রস্রবণ স্নান, অনসেন, সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে উপভোগ করা হয়। প্রবেশের আগে শরীর ভালোভাবে ধুতে হবে, লম্বা চুল বাঁধতে হবে। উল্কিচিহ্ন থাকলে আগে নিয়ম জেনে নিন; কিছু স্থানে এখনো সীমাবদ্ধতা আছে।
৯. এস্কেলেটরের দিক
টোকিওসহ পূর্ব জাপানে মানুষ বাম পাশে দাঁড়ায়, ডান পাশ হাঁটার জন্য খোলা রাখে। আর ওসাকাসহ পশ্চিমাঞ্চলে উল্টো নিয়ম। বিভ্রান্ত হলে সামনের জনকে অনুসরণ করুন।


১০. দলের স্বার্থ আগে
জাপানি সংস্কৃতিতে ব্যক্তির চেয়ে দলের স্বার্থ বড়। তাই উচ্চস্বরে কথা বা বিশৃঙ্খলা করাটা অগ্রহণযোগ্য। শান্ত, সংযত ও ভদ্র আচরণ আপনাকে সম্মানিত অতিথিতে পরিণত করবে।
সব নিয়ম নিখুঁতভাবে মানতেই হবে, এমন চাপ নেওয়ার দরকার নেই। আপনি অতিথি। তবে এসব সূক্ষ্ম আচরণ মেনে চললে জাপানি সংস্কৃতিকে ভালোভাবে বোঝা যায় এবং আতিথেয়তাকে সম্মান জানানো হয়।