প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া। নিরিবিলি বন, পাহাড় আর নদীর টানে প্রতি বছর সেখানে ছুটে যান হাজারো পর্যটক। তবে এবার সেই তাসমানিয়াতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের তৈরি ভুয়া তথ্যের ফাঁদে পড়ে বিপাকে পড়েছেন অনেক ভ্রমণপিপাসু। অনলাইনে খোঁজ পাওয়া এক ‘উষ্ণ ঝরনা’র সন্ধানে গিয়ে তারা আবিষ্কার করেন, জায়গাটির কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই।
তাসমানিয়ার উত্তর–পূর্বাঞ্চলের ছোট গ্রামীণ শহর ওয়েল্ডবরো এলাকায় নাকি রয়েছে ‘ওয়েল্ডবরো হট স্প্রিংস’ নামে এক শান্ত উষ্ণ ঝরনা—এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। বনঘেরা এলাকায় অবস্থিত এই ঝরনাকে হাইকিংপ্রেমীদের জন্য আদর্শ স্থান হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। সেই তথ্য বিশ্বাস করেই অনেক পর্যটক সেখানে ছুটে যান। কিন্তু পৌঁছে জানতে পারেন, এমন কোনো হট স্প্রিংস সেখানে আদৌ নেই।
এই বিভ্রান্তির সূত্রপাত একটি ভ্রমণ কোম্পানির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এআই দিয়ে তৈরি একটি ব্লগ পোস্ট থেকে। পরে পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হলেও তত দিনে অনেক পর্যটক ইতিমধ্যে ওয়েল্ডবরোর পথে রওনা হয়ে গেছেন।
অস্ট্রেলিয়ান ট্যুরস অ্যান্ড ক্রুজেসের মালিক স্কট হেনেসি ভুলের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনকে বলেন, এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও থেকেই পুরো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। হেনেসির ভাষায়, মার্কেটিং কনটেন্ট তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এবং তিনি তখন বিদেশে থাকায় সেটি যাচাই করার সুযোগ পাননি।
হেনেসি বলেন, তারা কোনোভাবেই প্রতারণা করতে চাননি। স্বামী–স্ত্রী মিলে একটি ছোট ব্যবসা হিসেবে তারা বাস্তব মানুষকে বাস্তব সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও আক্রমণে তাদের ব্যবসার সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ওয়েল্ডবরো হোটেলের মালিক ক্রিস্টি প্রোবার্ট প্রথমদিকে বিষয়টিকে নিছক মজা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর থেকে একের পর এক ফোন আসতে থাকে তথাকথিত উষ্ণ ঝরনার খোঁজে। তিনি জানান, শুরুতে দু–একটি ফোন এলেও পরে দিনে পাঁচটির মতো ফোন আসত এবং অন্তত দুই–তিনজন সরাসরি হোটেলে হাজির হতেন।
পরিস্থিতি সামলাতে একসময় তিনি রসিকতা করে বলতে শুরু করেন, কেউ যদি সত্যিই এই হট স্প্রিংস খুঁজে পান, তাহলে তার পক্ষ থেকে বিয়ার ফ্রি।
বাস্তবে ওয়েল্ড নদীর পানি এতটাই ঠান্ডা যে সেখানে নামতে হলে সাধারণত ওয়েটস্যুট পরতে হয়। প্রোবার্ট বলেন, এখানে মূলত নীলা ও টিন খুঁজতে আসা মানুষজনই নদীতে নামে।
ভ্রমণ পরিকল্পনায় এআইয়ের ঝুঁকি
অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন ক্রস বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন বিভাগের অধ্যাপক অ্যান হার্ডি মনে করেন, ভ্রমণ পরিকল্পনায় এখন মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি এআইয়ের ওপর নির্ভর করছে। তাঁর মতে, অনেক পর্যটক রিভিউ সাইট বা গাইডবুকের চেয়েও এআইকে বেশি বিশ্বাস করছেন। কিন্তু এই প্রযুক্তির বড় সমস্যা হলো তথাকথিত ‘হ্যালুসিনেশন’, অর্থাৎ বাস্তবে নেই এমন তথ্য বানিয়ে ফেলা।
হার্ডির গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে তৈরি প্রায় ৯০ শতাংশ ভ্রমণ সূচিতেই কোনো না কোনো ভুল থাকে। দুর্গম এলাকা যেমন তাসমানিয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের ভুল তথ্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তিনি জানান, অনেক সময় এআই এমন দিনের ট্রেকের পরামর্শ দেয়, যার দূরত্ব, পথের জটিলতা বা আবহাওয়ার তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
তাই তাঁর পরামর্শ, ভ্রমণের আগে শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর না করে বিশ্বস্ত গাইডবুক, স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
ওয়েল্ডবরো হোটেলের মালিক ক্রিস্টি প্রোবার্ট অবশ্য বিষয়টিকে খুব কঠোরভাবে দেখছেন না। তাঁর মতে, ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে সব তথ্য হালনাগাদ রাখা কঠিন, আর ভুল মানুষমাত্রই করে। তিনি বলেন, ওয়েল্ডবরোতে দেখার মতো অনেক কিছু আছে—শুধু কোনো উষ্ণ ঝরনা নেই।