ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় এমন একটি শহর যেখানে ব্যস্ততা আর প্রশান্তি একসঙ্গে ধরা দেয়। রাস্তাজুড়ে স্কুটার আর মানুষের স্রোত প্রথমে বিশৃঙ্খল মনে হলেও একটু তাকালেই বোঝা যায় এই শহরের নিজস্ব ছন্দ আছে। প্রাচীন মন্দির, শান্ত লেক, সুগন্ধি ফো আর অনন্য কফি সংস্কৃতি মিলিয়ে হ্যানয় অল্প সময়েই ভ্রমণকারীদের মনে জায়গা করে নেয়। মাত্র তিন দিনেই শহরের ইতিহাস, খাবার আর সংস্কৃতির স্বাদ নেওয়া সম্ভব।
কোথায় থাকবেন
হ্যানয়ে থাকার জন্য জনপ্রিয় একটি নাম সোফিটেল লেজেন্ড মেট্রোপোল হ্যানয়। ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্য আর ভিয়েতনামি ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি এই হোটেলটি ১৯০১ সালে যাত্রা শুরু করে। এখানেই ১৯৪৬ সালে বিখ্যাত এগ কফির জন্ম। হোটেলের ঐতিহাসিক ট্যুরে অংশ নিলে ফরাসি শাসনামল ও যুদ্ধকালীন সময়ের নানা গল্প জানা যায়। ভূগর্ভ বোমা শেল্টারটি সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
প্রথম দিন
চেক ইন শেষ করেই শহর বোঝার সেরা উপায় হলো স্থানীয় খাবারের ট্যুর। রাস্তার ধারে ছোট প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে বান চা, বো লা লট আর নানা ধরনের চে খেলে হ্যানয়ের আসল স্বাদ পাওয়া যায়।
দুপুরের পর সময় কাটান হোয়ান কিয়েম লেক এলাকায়। কিংবদন্তিতে ঘেরা এই লেক শহরের কোলাহলের মাঝেই এক টুকরো শান্তি। লেকপাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্থানীয়দের তাই চি অনুশীলন বা কফি পান করতে দেখা যায়। লাল রঙের হুক সেতু পেরিয়ে পৌঁছানো যায় এনগক সন মন্দিরে। বিকেলের সোনালি আলো লেকের দৃশ্যকে আরও মনোরম করে তোলে।
সন্ধ্যার পর ওল্ড কোয়ার্টার বদলে যায় আলো আর শব্দের রঙিন জগতে। টা হিয়েন স্ট্রিটের প্রাণচাঞ্চল্য দেখার পর কোনো স্পিকইজি ধাঁচের বারে বসে দিন শেষ করা যায়। রাতের খাবারে আধুনিক ভিয়েতনামি রান্নার রেস্তোরাঁ ভালো পছন্দ।
দ্বিতীয় দিন
সকালের শুরু হোক হ্যানয়ের কফি সংস্কৃতি দিয়ে। স্থানীয় রোস্টারিতে কফি ওয়ার্কশপে অংশ নিয়ে ভিয়েতনামি ব্ল্যাক কফি, এগ কফি আর নারকেল কফি তৈরির কৌশল শেখা যায়।
এরপর হাঁটতে হাঁটতে মধ্যাহ্নভোজ সারুন স্থানীয় কোনো বান মি দোকানে। খাবারের পর ভ্রমণ করুন টেম্পল অব লিটারেচার। ১০৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্থাপনাটি ভিয়েতনামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। পাশেই কোয়ান থান মন্দির, যা উত্তর দেবতার উদ্দেশ্যে নির্মিত।
বিকেলের শেষটা কাটান ওয়েস্ট লেকের তীরে অবস্থিত ট্রান কুয়ক প্যাগোডায়। এটি শহরের সবচেয়ে পুরোনো বৌদ্ধ উপাসনালয়। সূর্যাস্তের সময় লেক আর লাল টাওয়ারের দৃশ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে। প্রবেশের সময় শালীন পোশাক পরা জরুরি।
রাতে ফিরে যান ওল্ড কোয়ার্টারে। সরু গলির ভেতর থাকা ফো সুং স্টলে এক বাটি গরম ফো বো দিনটিকে নিখুঁতভাবে শেষ করে।
তৃতীয় দিন
শেষ দিনের সকালটা একটু ধীর গতিতে কাটান। কফি আর বান মি দিয়ে নাশতার পর বের হন ইতিহাসের খোঁজে। প্রথমে হোয়া লো কারাগার, যা হ্যানয় হিলটন নামেও পরিচিত। এখানে ভিয়েতনামি বিপ্লবী ও যুদ্ধবন্দিদের গল্প উঠে আসে প্রদর্শনীতে।
এরপর যান থাং লং ইম্পেরিয়াল সিটাডেলে। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই স্থান হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ভিয়েতনামের রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন গেট আর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শহরের দীর্ঘ ইতিহাসের কথা বলে।
সময় থাকলে হো চি মিনের সমাধিসৌধ দেখা যেতে পারে। দিনের শেষটা কাটান ট্রেন স্ট্রিটে। ক্যাফে আর বাড়ির একেবারে পাশ দিয়ে ট্রেন ছুটে যাওয়ার দৃশ্য হ্যানয়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।