দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। নীল জলরাশি আর সাদা বালুর এই দ্বীপ বছরের পর বছর ধরে পর্যটনের ওপর ভর করে বদলে ফেলেছে মানুষের জীবনধারা। কিন্তু পরিবেশ রক্ষার নামে টানা নিষেধাজ্ঞা এখন দ্বীপবাসীর জীবিকায় বড় সংকট তৈরি করেছে। পর্যটন বন্ধ থাকায় কাজ হারিয়েছেন হাজারো মানুষ। অনেকে জানেন না সামনে দিনগুলো চলবে কীভাবে।
এক সময় সেন্ট মার্টিনের মানুষের প্রধান পেশা ছিল মাছ ধরা ও সীমিত কৃষিকাজ। গত দুই দশকে দেশি বিদেশি পর্যটকের আগমনে দ্বীপের অর্থনীতি পুরোপুরি পর্যটননির্ভর হয়ে ওঠে। হোটেল রিসোর্ট রেস্তোরাঁ পরিবহন গাইড ক্যামেরাম্যানসহ নানা খাতে যুক্ত হন স্থানীয়রা। কিন্তু এই নির্ভরতাই এখন তাদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও প্লাস্টিক দূষণে দ্বীপের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকার গত দুই বছরে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পর্যটন মৌসুম ছোট করে ১২টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব শর্তে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কক্সবাজার থেকে দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের ভ্রমণ ও রাতযাপনের অনুমতি ছিল। এই সময় প্রায় এক লাখ দশ হাজার পর্যটক দ্বীপে যান।
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আবারও সেন্ট মার্টিনে পর্যটক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যা কার্যকর থাকবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। নভেম্বরে ভ্রমণের সুযোগ থাকলেও রাতযাপন নিষিদ্ধ থাকবে।
দ্বীপে বর্তমানে ২০০টির বেশি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব স্থাপনায় আট থেকে দশ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে। চলতি মৌসুমেই অর্ধেকের বেশি হোটেল রিসোর্ট বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ রয়েছে শতাধিক রেস্তোরাঁ। পর্যটনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত ইজিবাইক ভ্যান মোটরসাইকেল ও ট্যুর গাইডদের কাজও বন্ধ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই মাসের আয় দিয়ে পুরো বছর চালানো অসম্ভব। মারমেইড রিসোর্টের মালিক তৈয়ব উল্লাহ জানান, বড় শহরভিত্তিক রিসোর্টগুলো প্যাকেজ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করায় স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সি প্রবাল রিসোর্টের মালিক আবদুল মালেক জানান, বিচ ভিউ ছাড়া বেশিরভাগ রিসোর্ট বন্ধ রাখতে হয়েছে।
অন্যদিকে সাগরে মাছের আকাল দ্বীপবাসীর আরেক বড় সমস্যা। জেলেরা জানান, মাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি গভীর সাগরে গেলে আরাকান আর্মির ভয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, এখনো ৩৬ জন জেলে জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, প্রায় ১০ হাজার মানুষের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা কোথায়।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পর্যটনের চাপ কমায় জীববৈচিত্র্যের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি মানুষের জীবন জীবিকার কথাও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।