বর্ষার প্রথম দফার বৃষ্টিতে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পাহাড়ি ঝরনাগুলো। সবুজ পাহাড়, পাথুরে ঝিরিপথ আর সাদা ফেনায় ছুটে চলা জলধারা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন ভ্রমণপিপাসুরা। ঈদের দীর্ঘ ছুটি শুরু হওয়ার পর দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। তবে প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচেতনতা ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চললেই এ ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানের প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ একর বনাঞ্চলে অবস্থিত খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, রূপসী, সোনাইছড়ি ও ভাওয়াছড়া ঝরনা। এর মধ্যে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া ও রূপসী ঝরনা পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়। বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব ঝরনার সৌন্দর্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সারা বছর পর্যটক এলেও বর্ষা মৌসুমে দর্শনার্থীর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। চলতি বছর বৈশাখের ভারী বৃষ্টি এবং ঈদের ছুটি মিলিয়ে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি ছুটি ও উৎসবের দিনগুলোতে শুধু খৈয়াছড়া ঝরনাতেই দুই হাজারের বেশি পর্যটক আসছেন।
ঝরনাগুলোতে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জন্য ২০১০ সাল থেকে ইজারা পদ্ধতি চালু রয়েছে। চলতি বছরের ২৩ মে থেকে আগামী বছরের ২৪ মে পর্যন্ত এক বছরের জন্য ৪০ লাখ ১০০ টাকায় ঝরনাগুলোর ইজারা পেয়েছে থ্রি-বি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ইজারার শর্ত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে ২০ টাকা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে ১০ টাকা প্রবেশমূল্য নেওয়া হচ্ছে।
আনন্দের পাশাপাশি উদ্বেগ
মিরসরাইয়ের ঝরনাগুলোতে পৌঁছাতে পর্যটকদের পাথুরে ঝিরিপথ ও দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়। এ কারণে বর্ষাকালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে ঝরনার চূড়ায় ওঠা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা এবং সতর্কতা উপেক্ষা করার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে বিভিন্ন ঝরনা এলাকায় ছোট-বড় ৩৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাতজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৫১ জন।
সম্প্রতি খৈয়াছড়া ঝরনা ঘুরতে আসা ঢাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। তবে অনেক পর্যটক নিরাপত্তা নির্দেশনা না মেনে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে চলে যান, যা উদ্বেগের বিষয়।
দুর্ঘটনা এড়াতে করণীয়
বন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা কয়েকটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা থাকলে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, পিচ্ছিল পাথর ও ডুবোগর্ত সম্পর্কে সতর্ক থাকা, ঝরনার চূড়ায় না ওঠা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সেলফি না তোলা, স্থানীয় গাইড সঙ্গে রাখা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগ
বারৈয়ারঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে হ্যান্ডমাইকে প্রচার, নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং সচেতনতামূলক ব্যানার স্থাপন করা হয়েছে। গত এক বছরে দুর্ঘটনার হারও কিছুটা কমেছে।
থ্রি-বি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ওয়াহিদুল ইসলাম শরীফ বলেন, প্রবেশপথে কাউন্সেলিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে অনেক পর্যটক গাইড নিতে অনীহা দেখান কিংবা সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেন, যা ঝুঁকি বাড়ায়।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, সহজ যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে ঝরনাগুলো ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বন বিভাগ ও ইজারাদার সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তবে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।