ভ্রমণের পরিকল্পনায় মাথায় রাখার মতো অনেক কিছুই থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ভ্রমণের আগের টিকা নেওয়ার গুরুত্বটি অনেকের নজর এড়িয়ে যায়। বিশেষ করে যারা বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে যান, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে; কারণ দেশ ছাড়ার আগে তাদের টিকা নেওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, অন্যান্য পর্যটকদের তুলনায় এই দলটিরই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকার সম্ভাবনা থাকে।
এর কারণ হলো, তারা সাধারণত দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, স্থানীয় বা অনিরাপদ খাবার ও পানি গ্রহণ করেন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করেন।
যে কারণে ভ্রমণকালীন টিকা গুরুত্বপূর্ণ
যদিও সংক্রামক রোগ সব জায়গাতেই রয়েছে, তবুও কিছু কিছু গন্তব্যে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
উষ্ণমণ্ডলীয় জলবায়ু, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের মান এবং রোগবাহী কীটপতঙ্গ বা প্রাণীর কারণে এমনটা হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে শিশুদের টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং প্রাপ্তবয়স্কদের টিকা গ্রহণের কম আগ্রহও এজন্য দায়ী।
বিদেশে অসুস্থ হলে বড়জোর আপনার ছুটির পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে, আর সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে আপনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন এবং বিদেশের অজানা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
যেসব টিকার কথা ভাবা উচিত
টিকার প্রথম দলটি হলো নিয়মিত বা রুটিন টিকা, যা নির্দিষ্ট কোনো ভ্রমণের সাথে সম্পর্কিত নয় (যেমন: হাম বা ফ্লু-এর টিকা)।
পরবর্তী দলটি আপনার ভ্রমণ গন্তব্যের সংক্রামক রোগের ঝুঁকির ওপর নির্দিষ্ট (যেমন: টাইফয়েডের টিকা), অথবা কোনো ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত।
সবশেষে, কিছু কিছু টিকা আইনের দ্বারা বাধ্যতামূলক হতে পারে (যেমন: ইয়োলো ফিভার বা পীতজ্বরের টিকা, কিংবা মক্কায় গমনকারী যাত্রীদের জন্য টিকা)। কিছু দেশে প্রবেশের জন্য আপনি এই টিকাগুলো নিয়েছেন— এমন প্রমাণের প্রয়োজন হবে।
হাম
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস, যা গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করতে পারে। এটি শপিং সেন্টার বা উড়োজাহাজের মতো পাবলিক স্পেস বা গণজমায়েতের জায়গায় সহজেই ছড়াতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এর প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়াও রয়েছে, যেখানে আক্রান্তদের বেশিরভাগই বিদেশ থেকে (যার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় ছুটির গন্তব্যগুলোও রয়েছে) ফেরত আসা মানুষ।
তাই নিশ্চিত করুন যে আপনি হামের টিকার দুটি ডোজই নিয়েছেন। ছোটবেলায় আপনি দুটি ডোজ পেয়েছিলেন কিনা তা হয়তো আপনার জানা নাও থাকতে পারে। সেজন্য আপনার টিকার রেকর্ড বা ফ্যামিলি ডাক্তারের (GP) সাথে যোগাযোগ করা উচিত। যদি তাও নিশ্চিত হতে না পারেন, তবে আরেকটি ডোজ নেওয়া নিরাপদ, বিশেষ করে যদি আপনি বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন।
অস্ট্রেলিয়ায় শিশুদের এক বছর বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়, তবে ছোট শিশুরা গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে ছয় মাস বা তার বেশি বয়সী শিশুদের জন্য অতিরিক্ত একটি বিনামূল্যে হামের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করছে, যদি তারা বিদেশে যায়।
ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা
ভ্রমণকারীদের সংক্রমণের অন্যতম সাধারণ কারণ হলো ফ্লু। বেশিরভাগ মানুষই জানেন যে শরৎ বা শীতকালে তাদের ফ্লু-এর টিকা নেওয়া উচিত।
যাইহোক, এই টিকাটি প্রায় তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা দেয়। তাই যারা উত্তর গোলার্ধের শীতকালীন সময়ে ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য আরেকটি ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
হেপাটাইটিস ‘এ’
হেপাটাইটিস ‘এ’ হলো লিভার বা যকৃতের একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এটি দূষিত খাবার বা পানি অথবা কোনো সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। বিশ্বের অনেক অংশেই এটি বেশ সাধারণ।
এর একটি টিকা রয়েছে যা এক বছর বয়স থেকে দেওয়া যায়। অন্তত ছয় মাসের ব্যবধানে দুটি ডোজ নিলে এই রোগের বিরুদ্ধে আজীবন সুরক্ষা পাওয়া যায়।
টাইফয়েড
টাইফয়েড একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ যা তীব্র জ্বর এবং পেটে ব্যথার কারণ হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০-১৫% ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দেয়।
এশিয়া এবং উপ-সাহারান আফ্রিকায় ভ্রমণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। হেপাটাইটিস এ-এর মতোই টাইফয়েডও দূষিত খাবার এবং পানির মাধ্যমে ছড়ায়।
টাইফয়েডের টিকা দুই ধরণের হয়: একটি ইনজেকশন (যা দুই বছর বয়স থেকে দেওয়া যায় এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের জন্য নিরাপদ) এবং একটি মুখে খাওয়ার ওষুধ বা ওরাল ভ্যাকসিন (ছয় বছরের বেশি বয়সী মানুষের জন্য)।
জলাতঙ্ক
জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসের কারণে হয়, যা কোনো সংক্রমিত প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে ছড়ায়। কুকুর এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হলেও বাদুড়, বানর এবং বিড়ালসহ যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী সংক্রমিত হতে পারে। জলাতঙ্ক রোগ হলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত।
বিদেশে কোনো স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী বা যেকোনো জায়গায় বাদুড় দ্বারা কামড় বা আঁচড়ের শিকার হলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে জরুরি চিকিৎসার (যাকে "পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস" বলা হয়) প্রয়োজন হয়।
কামড় বা আঁচড় লাগার পর যত দ্রুত সম্ভব এই চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বিদেশে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
ভ্রমণের আগে জলাতঙ্কের টিকা নেওয়া থাকলে এই 'পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস'-এর প্রয়োজনীয়তা কমে যায় অথবা কোনো সংক্রমিত প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড়ালে আপনার চিকিৎসা প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
তাই ভ্রমণের আগে দুই বা তিনবারের একটি টিকাদান কোর্স সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এগুলোর বাইরেও কিছু টিকা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে-
• মশা বাহিত রোগ যেমন পীতজ্বর এবং জাপানিজ এনসেফালাইটিস
• কলেরা, যা তীব্র ডায়রিয়ার কারণ।
• এমপক্স, যা যৌনভাবে সক্রিয় সমকামী, উভকামী বা পুরুষদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী অন্য পুরুষদের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়।