সুপারইয়ট, আস্ত দ্বীপ বা বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ— অতিধনী ব্যক্তিদের পছন্দের তালিকায় অভাব নেই কোনো কিছুরই। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আভিজাত্য, ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির শেষ কথা যেন একটি ব্যক্তিগত বিমান বা প্রাইভেট জেট।
কোভিড মহামারি এবং ইরানযুদ্ধের মতো সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রাইভেট জেটের চাহিদা আকাশচুম্বী।
বৈশ্বিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত তথ্য সংস্থা ‘উইংএক্স’ এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিগত বিমানের উড্ডয়ন প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে।
আগে সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সীরা বিমান কিনতেন, এখন ৩০-এর কোঠায় থাকা ধনকুবেররাও এর ক্রেতা বলে ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ব্যক্তিগত বিমান শুধু কিনলেই চলে না। এটা কেবল খরচের শুরু। আসল খেলা হলো এটিকে ‘পুষে’ রাখা বা মেইনটেইন্যান্স।
১. প্রথম ধাক্কা: বিমান কেনার খরচ
বিমানের আকার ও দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে এর দাম নির্ধারিত হয়। ইউরোপ বা আমেরিকার ভেতরে ছোট দূরত্বের জন্য একটি লাইট জেটের দাম শুরু হয় প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে। তবে আন্তঃমহাদেশীয় বা দূরপাল্লার বড় জেট কিনতে চাইলে খরচ পড়বে ১১৮ কোটি থেকে শুরু করে ৯৪৪ কোটি টাকা পর্যন্ত।
২. মূল ব্যয়: রক্ষণাবেক্ষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিমানের পেছনে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হওয়া উচিত তার মূল দামের ৫ থেকে ১০ শতাংশ। বিমানটি যদি শুধুই হ্যাঙ্গারে (বিমানের গ্যারেজ) বসে থাকে, তাহলেও এই খরচ কমবে না। কারণ কিছু যন্ত্র কেনা বা পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময় পরপর করতেই হয়।
উদাহরণ হিসেবে, বিমানের একটি ইঞ্জিন ওভারহোল বা সম্পূর্ণ মেরামত করতেই খরচ হতে পারে প্রায় ৬০ কোটি টাকা (৫ মিলিয়ন)।
৩. জ্বালানি তেলে যাবে লাখ লাখ টাকা
জ্বালানি বা ফুয়েল খরচ নির্ভর করে বিমানটি কতবার উড়ছে তার ওপর। তবে গড়ে বছরে জ্বালানি বাবদ ৫ কোটি ৯০ লাখ থেকে ২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়।
৪. পাইলট ও ক্রু-এর বেতন
বিমান ওড়ার জন্য দক্ষ পাইলট তো লাগবেই। একজন অভিজ্ঞ পাইলটের বার্ষিক বেতন ১ কোটি থেকে শুরু করে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। দূরপাল্লার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য দুজন পাইলটের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বিমানে কেবিন ক্রু বা বিমানবালা রাখলে তাদের পেছনে বছরে খরচ হবে ৫৯ লাখ থেকে ৯৪ লাখ টাকা।
এছাড়া বিমান যখন অন্য কোনো দেশে গিয়ে থামবে, তখন এই ক্রু-দের হোটেল ও থাকা-খাওয়ার খরচও মালিককেই দিতে হবে।
৫. ভেতরের সাজসজ্জা বা ইন্টেরিয়র ডিজাইন
ধনী ব্যক্তিরা সাধারণত কোম্পানির তৈরি করা সাধারণ ইন্টেরিয়র পছন্দ করেন না। একটি মাঝারি আকারের পুরনো বিমানের ভেতরটা নিজেদের মতো আলিশান করে সাজাতে খরচ হয় ১৩ কোটি ২০ লাখ থেকে ৩৩ কোটি টাকা। আর যদি বোয়িং বা এয়ারবাসের মতো বিশাল আকৃতির বিমানকে রাজপ্রাসাদের মতো করে সাজাতে হয় (যা সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের শেখরা করে থাকেন), তবে ইন্টেরিয়র ডিজাইনেই চলে যায় ৫২৮ কোটি থেকে ৭৯২ কোটি টাকা। বিনোদনের জন্য শুধু অডিও-ভিডিও বা স্যাটেলাইট টিভি সিস্টেম বসাতেই খরচ হয় ৫৯ লাখ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক কোটি টাকা।
৬. অন্যান্য ‘ছোটখাটো’ খরচের ফাঁদ
• বীমা: বিমানের সুরক্ষার জন্য প্রতিবছর বীমার প্রিমিয়াম দিতে হয় ৪৭ লাখ থেকে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
• হ্যাঙ্গার বা পার্কিং ফি: বিমান রাখার জায়গার জন্য বছরে গুনতে হয় ৩৫ লাখ থেকে ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। শহরের ভেতরের বিমানবন্দর হলে এই খরচ আরও বাড়ে।
• বরফ গলানো: শীতপ্রধান দেশে শীতকালে বিমান ওড়ানোর আগে ডানা থেকে বরফ পরিষ্কার করতে প্রতিবারে খরচ হয় ৬ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা।
• অ্যাডমিন ও ল্যান্ডিং ফি: কোনো দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করা, বিমানবন্দরে ল্যান্ড করা এবং ট্যাক্স ও আইনি কাগজপত্রের পেছনেই বছরে কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়।
• খাবার-দাবার: বিমানে সাধারণ চিপস-বিস্কুট থেকে শুরু করে ফাইভ-স্টার হোটেলের শেফের তৈরি তাজা সুশি—সবকিছুর বিল ওড়ার ওপর ভিত্তি করে আসে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে প্রতিবারের খাবার বিলই কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এক নজরে শেষ কথা
দূর থেকে প্রাইভেট জেটের মালিক হওয়াকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হলেও, এর পেছনে যে বিপুল অঙ্কের আর্থিক অবকাঠামো জড়িয়ে রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। তাই অনেক ধনী ব্যক্তি এখন পুরো বিমান না কিনে পার্ট-টাইম বা আংশিক মালিকানা অথবা মেম্বারশিপ প্রোগ্রামের দিকে ঝুঁকছেন।