বিশ্বজুড়ে ধনীদের মধ্যে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘গোল্ডেন ভিসা’। অনেকের কাছে এটি শুধু বিদেশে বসবাসের অনুমতি নয়, বরং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিকল্প জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম।
সাধারণত কোনো দেশে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি দেওয়া হলে তাকে গোল্ডেন ভিসা বা রেসিডেন্সি-বাই-ইনভেস্টমেন্ট (Residency by Investment) বলা হয়।

গোল্ডেন ভিসা কী?
গোল্ডেন ভিসা হলো এমন একটি কর্মসূচি, যেখানে কোনো ব্যক্তি চাকরি, পারিবারিক সম্পর্ক বা ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি দেশে বসবাসের অধিকার অর্জন করতে পারেন।
তবে এটি সরাসরি নাগরিকত্ব নয়। গোল্ডেন ভিসা থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশে বসবাস, ব্যবসা পরিচালনা বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকার সুযোগ পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর নাগরিকত্বের আবেদন করার সুযোগও তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গোল্ডেন ভিসাকে অনেক ধনী ব্যক্তি ‘প্ল্যান-বি’ হিসেবে দেখেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভ্রমণ সুবিধা, উন্নত জীবনমান বা কর-সুবিধার জন্য তারা দ্বিতীয় কোনো দেশে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে চান।

কেন জনপ্রিয়?
গোল্ডেন ভিসার জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ—
•    উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় সন্তানদের সুযোগ
•    বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা
•    রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
•    ব্যবসা ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ
•    সহজ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ
•    বিকল্প আবাসনের নিরাপত্তা
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশগুলোর ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

কোন দেশগুলো গোল্ডেন ভিসা দেয়?
বর্তমানে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ বিভিন্ন ধরনের গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচি চালু রেখেছে।

সিঙ্গাপুর
বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল গোল্ডেন ভিসাগুলোর একটি রয়েছে সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুরের গ্লোবাল ইনভেস্টর প্রোগ্রামের আওতায় নতুন বা বিদ্যমান ব্যবসায় অন্তত ১ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার বিনিয়োগ করতে হয়। বিকল্প হিসেবে সরকার অনুমোদিত তহবিলে ২ কোটি ৫০ লাখ সিঙ্গাপুর ডলার বিনিয়োগের সুযোগও রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত অবকাঠামো এবং এশিয়ার আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানের কারণে এটি ধনীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

নিউজিল্যান্ড
২০২৬ সালে দেশটি তাদের ‘অ্যাকটিভ ইনভেস্টর প্লাস ভিসা’ কর্মসূচি সহজ করেছে।
এখানে তিন বছরের জন্য ৫০ লাখ নিউজিল্যান্ড ডলার উচ্চঝুঁকির বিনিয়োগ অথবা পাঁচ বছরের জন্য ১ কোটি নিউজিল্যান্ড ডলার বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

মোনাকো
মোনাকোতে আনুষ্ঠানিক গোল্ডেন ভিসা না থাকলেও বিনিয়োগভিত্তিক আবাসনের সুযোগ রয়েছে।
সাধারণত আবেদনকারীকে অন্তত ৫ লাখ ইউরো স্থানীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয় এবং মোনাকোতে বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকতে হয়।

সুইজারল্যান্ড
সুইজারল্যান্ডে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে বছরে কয়েক লাখ সুইস ফ্রাঁ কর পরিশোধ অথবা অন্তত ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে আবাসনের সুযোগ পাওয়া যায়।

মরিশাস
ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র মরিশাস ২০২৬ সালে ঘোষণা দিয়েছে, বছরে ১০০ জন বিদেশিকে গোল্ডেন ভিসা দেওয়া হবে।
এর জন্য ফিনটেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ১০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।
ইউরোপে সবচেয়ে জনপ্রিয় কোনগুলো?

পর্তুগাল
ইউরোপের সবচেয়ে জনপ্রিয় গোল্ডেন ভিসাগুলোর একটি।
বর্তমানে পর্তুগালে যোগ্য তহবিলে অন্তত ৫ লাখ ইউরো বিনিয়োগ করতে হয়। আগে রিয়েল এস্টেটের মাধ্যমে সুযোগ থাকলেও তা বাতিল করা হয়েছে।

ইতালি
ইতালির ইনভেস্টর ভিসার আওতায়—
•    স্টার্টআপে ২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো বিনিয়োগ অথবা
•    সরকারি বন্ডে ২০ লাখ ইউরো বিনিয়োগ করা যায়।

গ্রিস
ইউরোপের তুলনামূলক সহজ ও জনপ্রিয় গোল্ডেন ভিসাগুলোর একটি।
নির্দিষ্ট প্রকল্পে ২ লাখ ৫০ হাজার ইউরো বিনিয়োগ করেই আবাসনের সুযোগ পাওয়া যায়। তবে জনপ্রিয় অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৮ লাখ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।

গোল্ডেন ভিসা পেতে কী করতে হয়?
সাধারণত আবেদনকারীকে—
১. নির্ধারিত বিনিয়োগ করতে হয়
২. অর্থের বৈধ উৎস প্রমাণ করতে হয়
৩. নিরাপত্তা ও ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়
৪. প্রয়োজনীয় ফি ও আইনি ব্যয় বহন করতে হয়
৫. অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও আবাসনের প্রমাণ দেখাতে হয়
সব শর্ত পূরণ হলে আবেদনকারী ও তার পরিবারের সদস্যরা বসবাসের অনুমতি পান।

ঝুঁকিও আছে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গোল্ডেন ভিসা পাওয়ার আগে করনীতি, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।
কারণ অনেক সময় একাধিক দেশে বসবাসের অধিকার থাকলে কর সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচির নিয়মও পরিবর্তিত হতে পারে।
তবুও বিশ্বের ধনী ও আন্তর্জাতিক জীবনযাপনে আগ্রহী মানুষের কাছে গোল্ডেন ভিসা এখনো অন্যতম আকর্ষণীয় বিনিয়োগ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।