যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতে। বছরে প্রায় ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলার আয়ের এই শিল্প এখন নতুন করে বড় ধাক্কার মুখে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবুধাবি থেকে দুবাই পর্যন্ত বিলাসবহুল অবকাঠামো গড়ে তুলে যে ‘নিরাপদ ও প্রিমিয়াম ভ্যাকেশন হাব’ হিসেবে অঞ্চলটি নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছিল, সেই ভাবমূর্তি এখন ঝুঁকির মুখে।
বিশ্বের ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দুবাইসহ উপসাগরীয় প্রধান হাবগুলোতে ব্যাপক ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় হাজারো যাত্রী আটকা পড়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারির পর এটিই বিমান চলাচলে সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং প্রতীকী স্থাপনা বুর্জ আল আরব হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক পর্যটকদের উদ্বিগ্ন করেছে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক পর্যটকের ব্যয় ছিল প্রায় ১৯৪ বিলিয়ন ডলার।
ডেটা সংস্থা এয়ারডিএনএ জানায়, প্রাথমিক হামলার পর শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবকাশযাপন ভাড়ার (ভ্যাকেশন রেন্টাল) বাতিলের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৮,৪৫০ ইউনিটে পৌঁছায়, যার বেশিরভাগই মার্চ মাসের বুকিং। বাজেট এয়ারলাইন রায়ানএয়ারের সিইও মাইকেল ও’লিয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে বুকিংয়ে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে।” এর প্রভাব হিসেবে ইস্টার ছুটিকে সামনে রেখে পর্তুগাল, ইতালি ও গ্রিসের মতো স্বল্প দূরত্বের ইউরোপীয় গন্তব্যে চাহিদা বেড়েছে। তবে তার মতে, অঞ্চলটি অতীতেও অস্থিরতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যদিও আপাতত উপসাগরীয় আকাশপথে আস্থায় চিড় ধরেছে।
দুবাইয়ের পর্যটন দপ্তর জানিয়েছে, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। হোটেলগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত অতিথিদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে। তারা বলছে, বৈশ্বিক সংকট সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
![]()
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ট্যুরিজম ইকোনমিকস সতর্ক করে বলেছে, সংঘাতের স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করে এ বছর প্রত্যাশিত সংখ্যার তুলনায় ২ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ কম পর্যটক মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণ করতে পারেন। এতে দর্শনার্থী ব্যয়ে সম্ভাব্য ক্ষতি হতে পারে ৩৪ থেকে ৫৬ বিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তাৎক্ষণিক সংঘাত শেষ হলেও নেতিবাচক মনোভাব কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে।
ইউরোপের বড় ট্রাভেল গ্রুপ টিইউআইয়ের জার্মানি প্রধান বেঞ্জামিন জ্যাকোবি বলেন, ‘চাহিদায় অবশ্যই পতন আসবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সংঘাত কোন দিকে যায় তার ওপর।’
মধ্যপ্রাচ্যের হাব বন্ধ থাকায় এশিয়া-ইউরোপ রুটের ভাড়া বেড়েছে, বিকল্প পথ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন ভ্রমণকারীরা।
সংঘাত শুরুর পর বহু মানুষ দ্রুত অঞ্চল ত্যাগের চেষ্টা করেন। যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সব পর্যটক আতঙ্কিত নন। কেউ কেউ ক্রুজ জাহাজে বা হোটেলে অবস্থান করেই পরিস্থিতিকে ‘অদ্ভুত কিন্তু নিয়ন্ত্রিত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন শিল্প অতীতে সংকট কাটিয়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু এবারের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে অঞ্চলটির বিলাসবহুল ও নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা ইমেজ বড় ধাক্কা খেতে পারে।