আগুনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল একসময়। সেই পাহাড়চূড়ার বৌদ্ধবিহার এখনই হয়ে উঠেছে পর্যটকের অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০০ দর্শনার্থী ভিড় করছেন রামুর এই স্থানে, যেখানে ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নান্দনিক স্থাপনার এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজারের রামুর উত্তর মিঠাছড়ি এলাকায় পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের মূল আকর্ষণ ১০০ ফুট দীর্ঘ ‘সিংহশয্যা’ গৌতম বুদ্ধমূর্তি। পাহাড় বেয়ে উঠতে ৮৮ ধাপের পাকা সিঁড়ি। ধাপে ধাপে উঠতে গিয়ে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ বুদ্ধমূর্তি, আর শোনা যায় দর্শনার্থীদের কৌতূহলী কথোপকথন ও ক্যামেরার শব্দ।

চূড়ায় পৌঁছালে সামনে ভেসে ওঠে বিশাল শায়িত বুদ্ধমূর্তি, যা দেশের বৃহত্তমগুলোর একটি। মূর্তির দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট, উচ্চতা ৫০ ফুট এবং প্রস্থ ২২ ফুট। দক্ষিণমুখী মাথা ও উত্তরমুখী পা রেখে নির্মিত এই মূর্তি ধ্যানমগ্ন অবস্থার প্রতীক।

বিহারের প্রতিষ্ঠাতা করুণাশ্রী মহাথের জানান, ‘সিংহশয্যা’ নামের পেছনে রয়েছে প্রতীকী ব্যাখ্যা। সিংহ যেমন সতর্ক ভঙ্গিতে ডান কাতে শুয়ে থাকে, তেমনি গৌতম বুদ্ধও ধ্যানমগ্ন অবস্থায় একই ভঙ্গিতে বিশ্রাম নিতেন। সেই ভাবনাকেই প্রতিফলিত করা হয়েছে মূর্তিতে।

২০০৬ সালে মিয়ানমারের কারিগরদের দিয়ে মূর্তি নির্মাণ শুরু হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হলেও পরে দেশ-বিদেশের ভক্তদের সহায়তায় কাজ এগিয়ে যায়। ২০১২ সালের আগস্টে মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয়।

তবে একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ঘটে যায় ভয়াবহ হামলা। দুর্বৃত্তদের অগ্নিসংযোগে বিহারটি পুড়ে যায়। ভেতরে বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। সেই সময় প্রাণভয়ে আশপাশের লোকজন পালিয়ে যান। পরদিন দেখা যায়, বিহার ধ্বংস হলেও মূল বুদ্ধমূর্তিটি টিকে আছে। পরে সরকার ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুনর্গঠন করা হয় এবং মূর্তিটিকে নতুন করে সংস্কার করে সোনালি রঙে সাজানো হয়।

বর্তমানে এই স্থান শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রও। দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে বিস্ময় ও শ্রদ্ধা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আসছেন।

সম্প্রতি সিঁড়ির দুই পাশে ৩৯টি নতুন বুদ্ধমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। উত্তর পাশে ২১টি দাঁড়ানো মূর্তি, প্রতিটি ৭ ফুট উচ্চতার। দক্ষিণ পাশে ১৮টি বসা মূর্তি, প্রতিটির উচ্চতা ৪ ফুট। এতে দর্শনার্থীর আগ্রহ আরও বেড়েছে।

এছাড়া প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে নেওয়া হয়েছে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প। একটি পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে সংযোগ দিতে নির্মাণ হচ্ছে ২০০ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। এর শেষ প্রান্তে গড়ে তোলা হবে ১২০ ফুট উচ্চতার স্বর্ণজাদি। প্রায় পাঁচ কোটি টাকার এই প্রকল্প ধাপে ধাপে এগোচ্ছে অনুদানের ভিত্তিতে।

করুণাশ্রী মহাথের আশা প্রকাশ করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হবে।