পাহাড়ি খরস্রোতা সোমেশ্বরী নদী, জিআই স্বীকৃত সাদা মাটি এবং সীমান্তঘেঁষা মনোমুগ্ধকর পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ নেত্রকোণার দুর্গাপুর দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এই অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। এবার সেই চিত্র বদলানোর আশায় বুক বাঁধছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
জারিয়া থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত মাত্র ১২ কিলোমিটার রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সীমান্তবর্তী এই পর্যটন অঞ্চল। স্থানীয়দের বিশ্বাস, রেলসংযোগ চালু হলে শুধু পর্যটন নয়, অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াত ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
দীর্ঘদিন ধরে দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও ধোবাউড়া উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ জারিয়া-দুর্গাপুর রেললাইন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। নানা আন্দোলন, স্মারকলিপি ও জনদাবির পর এবার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সম্প্রতি জারিয়া ঝাঞ্জাইল রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করেছেন। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তার এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের আশা, এর মধ্য দিয়েই প্রায় ১১০ বছরের পুরোনো একটি স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯১২ সালে শ্যামগঞ্জ থেকে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল হয়ে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯১৮ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের লক্ষ্যে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। রেলকর্মীদের আবাসনের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং রেললাইন সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। এমনকি কংস নদ অতিক্রম করে দুর্গাপুরমুখী রেলপথ নির্মাণের জন্য মাটিকাটার কাজও শুরু হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। টংক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধসহ নানা কারণে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ এ অঞ্চলে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে আর অগ্রসর হয়নি। স্বাধীনতার পরও উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় দুর্গাপুর আজও রেলসুবিধা থেকে বঞ্চিত।
স্থানীয়দের মতে, জারিয়া-দুর্গাপুর রেললাইন কেবল একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়, বরং পুরো নেত্রকোণা অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন বিকাশের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে। রেলসংযোগ চালু হলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে সহজ ও কম খরচে যোগাযোগ সম্ভব হবে। এতে সীমান্ত পর্যটন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানও বাড়বে।
প্রবীণ সংস্কৃতিজন বীরেশ্বর চক্রবর্ত্তী বলেন, জীবদ্দশায় দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখবেন, তা তিনি কখনো ভাবেননি। তার মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও মনে করছেন, রেললাইন সম্প্রসারণ হলে দুর্গাপুর নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্প আরও গতিশীল হয়ে উঠবে এবং দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে স্থানীয় মানুষের।