ভিয়েতনামের ভিন মোক গ্রামের উপকণ্ঠে আজ বাতাসে দুলছে বাঁশের ঝাড়। রাস্তার ধারে সারি সারি স্ট্রিট ফুডের দোকান, লাল প্লাস্টিকের চেয়ারেই বসে মানুষ উপভোগ করছে গ্রিল করা ভাত ও নুডলসের নানা পদ। ঠান্ডা পানীয়ের জন্য রয়েছে কোকা-কোলার ফ্রিজ। সবকিছুই খুব সাধারণ ও স্বাভাবিক মনে হয়।
কিন্তু মাত্র ছয় দশক আগে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মধ্য ভিয়েতনামের এই গ্রামটিতে আট বছরে প্রায় ৯ হাজার টন বোমা ফেলেছিল মার্কিন বাহিনী।
আজকের খাবারের দোকানগুলোর পাশেই রয়েছে আরেকটি ভিন মোকের প্রবেশদ্বার—মাটির নিচে নির্মিত বিশাল এক সুড়ঙ্গ নগরী, যেখানে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় গ্রামের মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল।

বেঁচে থাকার জন্য মাটির নিচে
১৯৬৫ সালের আগে ভিন মোক ছিল একটি শান্ত জেলে গ্রাম। মধ্য ভিয়েতনামের কুয়াং ত্রি প্রদেশের উপকূলে অবস্থিত এই অঞ্চলে ছিল ধানক্ষেত, লাল ব্যাসল্ট মাটি, দক্ষিণ চীন সাগরের সোনালি সৈকত এবং বাঁশের বন।

কিন্তু সবকিছু বদলে যায় ১৯৫৪ সালের জেনেভা চুক্তির পর। প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের অবসান ঘটানো এই চুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনামকে বিভক্ত করা হয়। বেন হাই নদীর উত্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিমিলিটারাইজড জোন বা ডিএমজেড। এর পরের বছরই শুরু হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ।
ডিএমজেডের কাছাকাছি হওয়ায় ভিন মোক উত্তর ভিয়েতনামের সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথের পাশে অবস্থিত ছিল। ফলে পুরো যুদ্ধজুড়েই এটি মার্কিন ও দক্ষিণ ভিয়েতনামী বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
নিরন্তর বোমাবর্ষণের মুখে গ্রামবাসীরা বুঝতে পারলেন, পালিয়ে যাওয়া সমাধান নয়। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেদের গ্রামের নিচেই নতুন এক জগৎ তৈরি করবেন।
পর্যটন গাইড ও অ্যানাম ট্যুরের পরিচালক ভ্যান নগক ভু বলেন, “নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণের কারণে অন্য কোথাও চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না। জমি হারানোর ঝুঁকিও ছিল। তাই মাটির নিচে আশ্রয় তৈরি করাই ছিল সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।”
এরপর শত শত মানুষ টানা ছয় বছর কাটিয়েছেন সেই ভূগর্ভস্থ গ্রামে।

বসবাসের জন্য নির্মিত সুড়ঙ্গ নগরী
স্থানীয় জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৩ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপদস্থ নেতা ট্রান নাম ত্রুং এই এলাকায় সফর করে প্রথম ভূগর্ভস্থ বসতির ধারণা দেন।
তিনি মনে করেছিলেন যুদ্ধ উত্তরের দিকে ছড়িয়ে পড়বে। তাই হো চি মিন সিটির কাছে অবস্থিত বিখ্যাত কু চি সুড়ঙ্গ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি ভূগর্ভস্থ আবাসন ও সরবরাহব্যবস্থা নির্মাণের পরিকল্পনা করেন।

তবে কু চি ছিল সরু ও হামাগুড়ি দিয়ে চলার মতো সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক। বিপরীতে, ভিন মোককে পরিকল্পিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ভূগর্ভস্থ গ্রামে রূপ দেওয়া হয়। এখানে প্রধান সুড়ঙ্গগুলো এতটাই উঁচু ছিল যে মানুষ দাঁড়িয়ে হাঁটতে পারত। সুড়ঙ্গের দেয়াল কেটে তৈরি করা হয়েছিল পরিবারভিত্তিক বসবাসের কক্ষ।
স্থানীয় গাইড ট্রান মি হোয়া বলেন, “এলাকার মানুষ আগেই ছোট আশ্রয়কেন্দ্র খনন করতে জানত। এখানকার মাটি যথেষ্ট শক্ত ছিল, ফলে সহজে ধসে পড়ত না, আবার সাধারণ যন্ত্র দিয়েই খনন করা যেত।”
১৯৬৫ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ দুই বছর ধরে চলে। সীমান্ত পুলিশ কমান্ডার লে জুয়ান ভি পুরো প্রকল্পের তত্ত্বাবধান করেন।

বোমা প্রতিরোধী প্রকৌশলের বিস্ময়
এক মাইলেরও বেশি বিস্তৃত এই সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সের প্রতিটি অংশই ছিল টিকে থাকার জন্য পরিকল্পিত।
বিস্ফোরণের অভিঘাত সরলরেখায় ছড়ায় বলে সুড়ঙ্গগুলো আঁকাবাঁকা করে নির্মাণ করা হয়েছিল। কোথাও ছিল খিলান আকৃতির ছাদ, কোথাও পুরু দেয়াল—সবই বোমার আঘাত কমানোর উদ্দেশ্যে।

ভ্যান নগক ভু বলেন, “সুড়ঙ্গের বহির্গমন পথগুলো ছিল পুরো ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
মোট ১৩টি বহির্গমন পথ কৃষিজমি ও সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। সমুদ্রমুখী পথগুলো ব্যবহার করে গোপনে কন কো দ্বীপে সরবরাহ পাঠানো হতো।
পানির জন্য খনন করা হয় কূপ। আর বিপরীতমুখী প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করত।

অন্ধকারে কাটানো দীর্ঘ বছর
উজ্জ্বল সূর্যালোক আর উষ্ণ আবহাওয়া ছেড়ে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে বসবাস করা যে কতটা কঠিন ছিল, ভিন মোক সফর করলে তার সামান্য ধারণা পাওয়া যায়।
সুড়ঙ্গগুলো তিনটি স্তরে নির্মিত হয়েছিল—ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৭৫ ফুট নিচে। সরু করিডরগুলো গিয়ে মিশেছে বড় বড় কমিউনিটি কক্ষে। আর দেয়ালের ছোট ছোট খোপ ছিল পরিবারের শোবার জায়গা।

ধারণা করা হয়, ১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে প্রায় ৪০০ মানুষ এখানে বসবাস করেছিল।
দিনের বেলা সবাই ভূগর্ভে থাকত। রাত হলে তারা বেরিয়ে কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং খাদ্য সংগ্রহ করত।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য হলো পারিবারিক কক্ষগুলো। মাত্র তিন ফুট উঁচু ও ছয় ফুট গভীর ছোট্ট কুঠুরি, যেখানে পুরো পরিবার ঘুমাত। এক রাত কাটানোই যেখানে কঠিন, সেখানে বছরের পর বছর বসবাস ছিল অকল্পনীয় কষ্টের।

যুদ্ধের মাঝেও নতুন জীবনের জন্ম
ভূপৃষ্ঠে যখন মৃত্যু ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন ভূগর্ভে জন্ম নিচ্ছিল নতুন জীবন।
সুড়ঙ্গের একটি কক্ষকে প্রসূতি ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হতো। গাইডদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৭টি শিশুর জন্ম হয়েছিল ভিন মোকের এই ভূগর্ভস্থ গ্রামে।
ভ্যান নগক ভু বলেন, “সাধারণ একটি ছুরি দিয়ে নাড়ি কাটা হতো। নবজাতককে জড়িয়ে রাখা হতো পুরোনো কাপড়ে।”
শিশুদের প্রথমে মায়ের দুধ খাওয়ানো হতো। পরে ধীরে ধীরে কাসাভা ও মিষ্টি আলুর মণ্ড খাওয়ানো শুরু করা হতো।

ধোঁয়াবিহীন রান্নার কৌশল
গ্রামবাসীদের রান্নাও করতে হতো। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ধোঁয়া।
যদি ধোঁয়া ভূপৃষ্ঠে দেখা যেত, তাহলে শত্রুপক্ষ তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারত।
এই সমস্যার সমাধান ছিল “হোয়াং কাম” চুলা ব্যবস্থা। উত্তর ভিয়েতনামের এক সৈনিক এটি উদ্ভাবন করেছিলেন।
রান্নাঘরগুলো প্রথম স্তরে স্থাপন করা হয়। শুকনো জ্বালানি ব্যবহার করে কম ধোঁয়া উৎপন্ন করা হতো। আর দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ নালার মাধ্যমে ধোঁয়া ঠান্ডা হয়ে ছদ্মবেশী ভেন্ট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেত।

একটি অবিনাশী আশ্রয়
ভিন মোকের প্রকৌশল এতটাই কার্যকর ছিল যে জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর বোমাবর্ষণের মধ্যেও সুড়ঙ্গের ভেতরে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
মার্কিন বাহিনী সুড়ঙ্গগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানত। কিন্তু তারা কখনো এই ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স ধ্বংস করতে পারেনি।
আজকের শান্ত ভিন মোক
সুড়ঙ্গ ভ্রমণের শেষ অংশে দর্শনার্থীরা খাড়া সিঁড়ি বেয়ে সমুদ্রমুখী একটি বহির্গমন পথে উঠে আসেন।
ভূপৃষ্ঠে উঠে প্রথমেই মুখে লাগে দক্ষিণ চীন সাগরের শীতল বাতাস। দীর্ঘ অন্ধকার ও নীরবতার পর ঢেউয়ের গর্জন যেন নতুন করে জীবন অনুভব করায়।
আজ ভিন মোক হলো ভিয়েতনামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহাসিক শহর হুয়ে থেকে অনেক পর্যটক এখানে একদিনের সফরে আসেন। ডিএমজেড ট্যুরের অংশ হিসেবেও এটি দেখা যায়, যেখানে খে সান যুদ্ধঘাঁটি, লং হুং গির্জার ধ্বংসাবশেষ এবং উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামকে বিভক্ত করা হিয়েন লুং সেতুও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

আজকের শান্ত কুয়াং ত্রি প্রদেশে ভ্রমণ করলে বিশ্বাস করাই কঠিন যে এটি একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বোমাবর্ষণের শিকার অঞ্চলগুলোর একটি ছিল।
সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের পাশের ছোট্ট দোকানে বসে এক বাটি গরম ফো বো স্যুপ খেতে খেতে দর্শনার্থীরা ভাবতে পারেন—মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কতটা অসাধারণ সংগ্রাম করতে পারে।
ভিন মোক সেই সংগ্রামেরই এক ভয়ংকর, কিন্তু বিস্ময়কর স্মারক। যুদ্ধ মানুষকে চরম পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করায়, আর ভিন মোকের ভূগর্ভস্থ গ্রাম তার অন্যতম জীবন্ত প্রমাণ।