চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপ আসে, সঙ্গে নিয়ে আসে বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এবার শুধু ফুটবল নয়, আলোচনায় রয়েছে খরচ, আবাসন সংকট এবং ফিফাকে ঘিরে নতুন এক বিতর্ক।
এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোতে। ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮ দল অংশগ্রহণ করায় এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। একই সঙ্গে এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসরগুলোর একটিতেও পরিণত হয়েছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী ‘ফারআউট’ লিখেছে, বিশ্বকাপের দর্শকদের জন্য ভ্রমণ ও আবাসন ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। সমালোচকদের মতে, এই সংকট তৈরিতে ফিফারও ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই ফিফার পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, বিশেষ করে হোটেল বুকিংকে কেন্দ্র করে।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো একসময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে বিশ্বকাপ হবে দর্শকবান্ধব এবং কিছু ভ্রমণ ব্যয় ভর্তুকি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, টিকিটের দাম প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি।

ইনফান্তিনো আরও দাবি করেছিলেন, এই বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবদান রাখবে এবং প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এসব পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ফিলাডেলফিয়া থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত বিভিন্ন শহরের হোটেলগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
আগের বিশ্বকাপগুলোর মতো এবারও ফিফা হাজার হাজার হোটেল কক্ষ আগাম বুক করে রাখে। কর্মকর্তা, স্পন্সর, ভিআইপি অতিথি, রেফারি ও টেকনিক্যাল স্টাফদের জন্য এসব কক্ষ সংরক্ষিত ছিল। এতে হোটেল মালিকরা শুরুতে বেশ আনন্দিত ছিলেন।

কিন্তু পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। ফিফা তাদের চুক্তিতে থাকা ‘ফ্রি ক্যানসেলেশন’ সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক কক্ষ বাতিল করতে শুরু করে। মার্চ মাসে ১৬টি আয়োজক শহরেই বড় পরিসরে বুকিং বাতিল করা হয়। শুধু ফিলাডেলফিয়াতেই ২ হাজারের বেশি এবং ভ্যাঙ্কুভার শহরে প্রায় ১৫ হাজার কক্ষ বাতিল করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে হোটেল মালিকদের বৃহত্তম সংগঠন ‘আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের’ হিসাব অনুযায়ী, ফিফা আগাম বুক করা কক্ষগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাতিল করেছে।

এর ফলে হোটেল শিল্পে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। প্রত্যাশিত চাহিদার ভিত্তিতে হোটেলগুলো কক্ষের ভাড়া অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বুকিং বাতিল হওয়ার পর সেই উচ্চমূল্যের কক্ষ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত দর্শনার্থীর সংখ্যাও পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া, ব্যয়বহুল টিকিট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ—সব মিলিয়ে অনেক সমর্থক ভ্রমণের আগ্রহ হারিয়েছেন।

মে মাসে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেল বুকিং পূর্বাভাসের চেয়ে কম রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জুন বা জুলাই মাসের সাধারণ সময়ের তুলনায়ও বুকিং খুব বেশি বাড়েনি।
তবে সব দোষ ফিফার নয়। শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণও এতে ভূমিকা রেখেছে। তবুও সমালোচকদের মতে, ফিফার সিদ্ধান্ত ও অতিরিক্ত মুনাফাকেন্দ্রিক মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এই বিতর্ক দুটি বিষয় সামনে নিয়ে আসে। প্রথমত, এত বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস ও পরিকল্পনার ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ফিফার আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনা এখনও থামেনি।
তবে শেষ পর্যন্ত ফিফার আশা, মাঠের লড়াই এবং ফুটবলের উত্তেজনা এসব বিতর্ককে ছাপিয়ে যাবে—যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে।