সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য জাফলং, বিছনাকান্দি কিংবা রাতারগুলের নাম অনেকেরই জানা। তবে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে কোনো অংশে কম নয় সীমান্তঘেঁষা লোভাছড়া। নদী, পাহাড়ি টিলা, চা-বাগান ও নির্জন সবুজের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলটি এখনও পর্যটনের মূল স্রোতের বাইরে থাকলেও এর সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী স্থানীয়রা।
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের মূলাগুল এলাকায় অবস্থিত লোভাছড়া প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য। ভারতের মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন এই জনপদকে ঘিরে রয়েছে লোভা নদী, সুরমা নদী এবং দেছই, কালিজুড়ি ও নুন নদীসহ অসংখ্য খাল-নদী। এসব জলধারা পুরো এলাকাকে অনেকটা দ্বীপসদৃশ রূপ দিয়েছে।
লোভাছড়ায় পৌঁছানোর পথও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। বর্ষা মৌসুমে নৌকায় এবং শুষ্ক সময়ে হাঁটা কিংবা মোটরসাইকেলে যেতে হয়। লোভা নদী পার হয়ে আঁকাবাঁকা মাটির পথ, ছোট-বড় টিলা ও সবুজ চা-বাগানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয় জিরো পয়েন্টের দিকে। দীর্ঘ এই যাত্রাপথই পর্যটকদের কাছে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক ঝুলন্ত সেতু, শতবর্ষী লোভাছড়া চা-বাগান এবং ভারত থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির লোভা নদী। পাশাপাশি পাথর কোয়ারি, বালুমহাল, জলমহাল এবং কয়েক শতাব্দী পুরোনো জনবসতির ইতিহাস এ অঞ্চলের বৈচিত্র্য আরও বাড়িয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোট-বড় পাহাড়, উঁচু-নিচু টিলা এবং পাহাড়ি নদীর সমন্বয়ে লোভাছড়া সহজেই একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু যোগাযোগ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এখনো এর বিকাশের প্রধান বাধা।
লোভা নদীর ওপর কোনো সেতু না থাকায় উপজেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। কানাইঘাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের মূল পর্যটন এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। বর্ষায় নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়াই একমাত্র উপায়।
পর্যটক সাইফুল ইসলাম বলেন, সিলেটের অনেক দর্শনীয় স্থানে ঘুরেছেন তিনি, তবে লোভাছড়ার যাত্রাপথই তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। তার মতে, নদী, টিলা ও চা-বাগানের সমন্বয়ে পুরো পথটি যেন প্রকৃতির জীবন্ত ক্যানভাস। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে এখানে পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়বে।
মূলাগুল এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদিরও একই দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি সেতুর অভাবে সম্ভাবনাময় এই অঞ্চল পর্যাপ্ত পর্যটক পাচ্ছে না। সেতু নির্মিত হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান শাকিল জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এখনো লোভাছড়াকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিকাশের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) লোভা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। সেতু নির্মিত হলে লোভাছড়া গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।