বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া তখন আর মাত্র ৪০০ মিটার দূরে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে তুষারঝড়ে চোখ প্রায় অন্ধ হয়ে আসে, গগলস ঢেকে যায় বরফে, আর ছিঁড়ে যায় পায়ের ক্র্যাম্পন। মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ খাড়া ঢালে দাঁড়িয়ে স্বপ্নভঙ্গের শঙ্কা ঘিরে ধরেছিল বাংলাদেশের পর্বতারোহী নুরুননাহার নিম্নিকে। তবে শেষ পর্যন্ত সব প্রতিকূলতা জয় করে গত ২৭ মে তিনি এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়ান। এর মধ্য দিয়ে তিনি হন এভারেস্টজয়ী বাংলাদেশের তৃতীয় নারী।

প্রথম প্রচেষ্টায় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ক্যাম্প ৩ থেকেই ফিরে আসতে হয়েছিল নিম্নিকে। দ্বিতীয়বারের অভিযানে তিনি নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করেন। ২৫ মে সকালে ক্যাম্প ২ থেকে ক্যাম্প ৩-এর উদ্দেশে রওনা দেন। সঙ্গে ছিল প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সিলিন্ডার ও অল্প কিছু শুকনা খাবার।

ক্যাম্প ২ থেকে ক্যাম্প ৩-এর পথের শুরুটা তুলনামূলক সহজ হলেও পরে অপেক্ষা করছিল খাড়া বরফের দেয়াল। জুমার ও ক্র্যাম্পনের সাহায্যে একের পর এক রোপ অতিক্রম করে মাত্র চার ঘণ্টায় ৭ হাজার ৭০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প ৩-এ পৌঁছে যান তিনি।

ক্যাম্প ৩-এ পৌঁছানোর পরই শুরু হয় ভারী তুষারপাত। সীমিত খাদ্য ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে তাঁবুতেই কাটাতে হয় সময়। তবু সহ-অভিযাত্রীদের সঙ্গে একে অপরকে উৎসাহ দিয়ে সামনের লক্ষ্যেই চোখ রাখেন নিম্নি।

পরদিন ক্যাম্প ৪-এর পথে আবহাওয়া আরও খারাপ হয়ে ওঠে। তীব্র তুষারঝড়ের মধ্যে খাড়া বরফঢাল বেয়ে এগিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘ লড়াই শেষে ৮ হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ক্যাম্প ৪-এ পৌঁছান তিনি। ‘ডেথ জোন’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং বৈরী পরিবেশ পর্বতারোহীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সন্ধ্যায় শুরু হয় চূড়ান্ত সামিট পুশ। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় প্রথম দল হিসেবে ক্যাম্প ৪ ত্যাগ করেন নিম্নি ও তাঁর সঙ্গীরা। কিন্তু ব্যালকনি পয়েন্ট অতিক্রম করার পর আবার শুরু হয় প্রবল বাতাস ও তুষারঝড়।

এ সময় গগলসের ফাঁক দিয়ে তুষার ঢুকে চোখে জ্বালা সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন হঠাৎ বাঁ পায়ের ক্র্যাম্পন ছিঁড়ে যায়। খাড়া ঢালে দাঁড়িয়ে তিনি গাইডকে ডাকলেও বাতাসের গর্জনে তা শোনা যাচ্ছিল না। পরে অন্য এক শেরপার সহায়তায় গাইড এসে দড়ি দিয়ে ক্র্যাম্পন বেঁধে দেন। আরেকজন নিজের স্নো গগলস খুলে দেন তাঁকে।

এরপর নতুন আত্মবিশ্বাসে আবার এগিয়ে চলেন নিম্নি। একের পর এক বরফঢাল অতিক্রম করে পৌঁছে যান হিলারি স্টেপে। সেখান থেকে শিখর ছিল মাত্র ৬০ মিটার দূরে।

এরই মধ্যে পূর্ব আকাশে ফুটে ওঠে নতুন দিনের আলো। আবহাওয়া পরিষ্কার হয়ে গেলে চোখের সামনে উন্মোচিত হয় এভারেস্টের চূড়া। বহু বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ, অপেক্ষা ও স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে সেই মুহূর্তে।

অবশেষে ২৭ মে এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করেন নুরুননাহার নিম্নি। মৃত্যুঝুঁকি, তুষারঝড় ও শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে লেখা হয় বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসের আরেকটি গৌরবময় অধ্যায়।