ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার, স্বজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা। সুন্দরবনের দুয়ার হিসেবে পরিচিত এই জেলায় রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, নদীঘেরা পরিবেশ ও আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রের সমন্বয়। ফলে ঈদের ছুটিতে জেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পটে বাড়ছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও দর্শনার্থী সেবায় বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যারা স্বল্প খরচে প্রকৃতি, ইতিহাস ও অবকাশযাপন একসঙ্গে উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য সাতক্ষীরা হতে পারে আদর্শ গন্তব্য।

শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক

সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক জেলার অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র। শহরের ব্যস্ততা ও কোলাহলের মাঝেও সবুজে ঘেরা এই পার্ক দর্শনার্থীদের স্বস্তির পরিবেশ উপহার দেয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা ঘটনারও নীরব সাক্ষী। সকাল ও বিকেলে পার্কজুড়ে শিশু, তরুণ এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতি দেখা যায়। ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য এটি হতে পারে সহজ ও আরামদায়ক গন্তব্য।

মোজাফফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্ট

সাতক্ষীরায় ‘মন্টু মিয়ার বাগানবাড়ি’ নামে পরিচিত মোজাফফর গার্ডেন অ্যান্ড রিসোর্ট জেলার অন্যতম পরিচিত অবকাশকেন্দ্র। প্রায় ১২০ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই রিসোর্টটি ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কে এম খায়রুল মোজাফফর।

প্রশস্ত সবুজ প্রান্তর, উন্মুক্ত পরিবেশ ও নান্দনিক সাজসজ্জা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। এখানে আবাসনের জন্য চারটি ভবনে মোট ৩০টি কক্ষ রয়েছে। পরিবার নিয়ে রাতযাপনের সুবিধাও পাওয়া যায়।

লেক ভিউ রিসোর্ট

সাতক্ষীরা শহরের অন্যতম জনপ্রিয় অবকাশ ও বিনোদনকেন্দ্র লেক ভিউ রিসোর্ট। জেলা সদর সংলগ্ন বাইপাস সড়কের কালামনগর এলাকায় অবস্থিত এই স্থানে রয়েছে রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও অনুষ্ঠান আয়োজনের সুবিধা।

লেকের মাঝখানে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা এবং সেখানে পৌঁছানোর সেতু দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। মনোরম পরিবেশে খাবার ও অবকাশযাপনের জন্য ঈদের ছুটিতে এটি হতে পারে চমৎকার একটি গন্তব্য।

তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ

তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে অবস্থিত প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ মুসলিম স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন।

শিলালিপি থেকে জানা যায়, জমিদার সালামতউল্লাহ খান ১২৭০ বঙ্গাব্দে কলকাতার সিন্দুরে পট্টি মসজিদের আদলে এটি নির্মাণ করেন। ১২টি স্তম্ভের ওপর নির্মিত এই মসজিদে রয়েছে ছয়টি গম্বুজ ও ২০টি সুউচ্চ মিনার। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থাপনাটি সংরক্ষণ করছে।

রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র

‘মিনি সুন্দরবন’ নামে পরিচিত রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের স্থান।

দেবহাটা উপজেলার শিবনগর গ্রামে ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত এই কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বনে রয়েছে কেওড়া, বাইন ও গরানসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। নদীর তীরঘেঁষা হাঁটার পথ, সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

বনবিবির বটতলা

দেবহাটা উপজেলা সদরে অবস্থিত বনবিবির বটতলা সাতক্ষীরার অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক নিদর্শন। প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরোনো এই বিশাল বটগাছ বিস্তৃত এলাকা জুড়ে এক ধরনের প্রাকৃতিক বনভূমির আবহ তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের বিশ্বাস ও জনশ্রুতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই স্থান প্রকৃতি ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে সমান আকর্ষণীয়।

ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি

সাতক্ষীরার দেবহাটা ও শ্যামনগর উপজেলায় ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি।

শ্যামনগরের নকিপুর জমিদার বাড়ি, যা জমিদার হরিচরণ রায়ের বাড়ি নামেও পরিচিত, উনিশ শতকের স্থাপত্য ঐতিহ্যের স্মারক। এছাড়া টাউন শ্রীপুর জমিদার বাড়িও প্রাচীন নির্মাণশৈলীর জন্য দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।

নলতা শরীফ

কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামে অবস্থিত নলতা শরীফ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত।

শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক খান বাহাদুর আহসানউল্লাহর সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই কমপ্লেক্সে রয়েছে মসজিদ, মাজার, গ্রন্থাগার, অতিথিশালা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও দৃষ্টিনন্দন সমাধিসৌধ। প্রতিবছর ওরস মাহফিলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো ভক্ত সমবেত হন।

প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ

কালীগঞ্জ উপজেলার প্রবাজপুরে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদ ১৬৯৩ সালে নির্মিত হয়। এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর একটি।

মসজিদটি ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। ইতিহাস, স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে এটি পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক

সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় গন্তব্য।

খোলপেটুয়া নদী, ম্যানগ্রোভ বন, কাঠের সেতু, ওয়াচ টাওয়ার এবং বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি এ স্থানকে আরও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ও নদীর অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে সাতক্ষীরা

বাংলাদেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পশ্চিমাংশে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ সাতক্ষীরা। ফলে প্রকৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং অবকাশযাপন একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে ঈদের ছুটিতে সাতক্ষীরা হতে পারে দেশের অন্যতম সেরা ভ্রমণ গন্তব্য।

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশা, ঈদে দর্শনার্থীদের পদচারণায় জেলার পর্যটন খাত আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।