জন লেননের ঘনিষ্ঠজনদের মতে, জাপানের প্রতি তার ভালোবাসা শুরু হয় স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সঙ্গে পরিচয়েরও বহু আগে। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি জাপানি ‘জেন’ দর্শন চর্চা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন, যা মননশীলতা ও মানসিক ভারসাম্যের ওপর জোর দেয়।

একই সঙ্গে তিনি জাপানি কবিতার ধারা ‘হাইকু’র প্রতিও গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। এসব দর্শন ও শিল্পচর্চা শুধু তার ব্যক্তিগত জীবন নয়, সংগীতকেও প্রভাবিত করেছিল।

এ কারণেই দ্য বিটলস প্রথমবার জাপানে পারফর্ম করার সময় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও লেনন স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেন। এমনও বলা হয়, এক রাতে তিনি ব্যান্ডের হোটেল থেকে বেরিয়ে জাপানের পুরনো সামগ্রীর দোকান ঘুরে দেখেছিলেন।

সেই বছরের নভেম্বরে তিনি জাপানি কনসেপ্টুয়াল শিল্পী ইয়োকো ওনোর একক প্রদর্শনী দেখতে যান। প্রদর্শনীটি তাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, সেখান থেকেই তাদের পরিচয় এবং পরবর্তীতে প্রেমের সম্পর্কের সূচনা হয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ‘ফার আউট’ লিখেছে, ১৯৬০-এর দশকে হিপ্পি আন্দোলনের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বে প্রাচ্য দর্শনের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ব্যান্ডসঙ্গী জর্জ হ্যারিসন হিন্দু দর্শনের অনুসারী ছিলেন, আর লেনন ভারতীয় দর্শন ও বৌদ্ধধর্ম নিয়ে গভীর আগ্রহ দেখান।

১৯৭১ সালে লেনন ও ওনো ব্যক্তিগত সফরে জাপান যান। সফরের সময় তারা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান, যার মধ্যে ছিল ওনোর পরিবারের বাড়িও। এই সময় লেননের হাইকুর প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে, বিশেষ করে লেখক আর. এইচ. ব্লাইদের বই পড়ে।

জাপান সফরের সময় তারা নিয়মিত যে জায়গায় থাকতেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল মামপেই হোটেল। পাহাড়ঘেরা অবকাশযাপনকেন্দ্র কারুইজাওয়াতে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী হোটেলটি দীর্ঘদিন ধরেই জাপানের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের প্রিয় গন্তব্য।

হোটেলটির যাত্রা শুরু ১৮৯৪ সালে। পরে ১৯০২ সালে এটি বর্তমান স্থানে পুনর্নির্মাণ করা হয়। বিদেশি অতিথিদের পরামর্শে নকশা করা এই হোটেলে শুরুতে ২২টি কক্ষ ছিল, যা পরে ধাপে ধাপে বাড়ে।

উঁচু পাহাড়ি অবস্থানের কারণে গ্রীষ্মকালেও এখানে আবহাওয়া ছিল শীতল ও আরামদায়ক। সবুজ প্রকৃতি ও বিলাসবহুল পরিবেশ লেনন পরিবারের এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে, তারা নিয়মিত অতিথিতে পরিণত হন। ধীরে ধীরে হোটেলটি যেন তাদের দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে ওঠে।

এমনকি লেনন নিজেও হোটেলের খাবারের মেনুতে প্রভাব ফেলেছিলেন। তার উদ্যোগে সকালের নাস্তায় অ্যাপল পাই, ফ্রেঞ্চ টোস্ট এবং তার নিজস্ব রেসিপির ‘রয়্যাল মিল্ক টি’ যোগ করা হয়।

মামপেই হোটেল জাপানের অন্যতম প্রাচীন হোটেল এবং এটি ‘জাপানস ক্লাসিক হোটেলস’ নামের বিশেষ তালিকার সদস্য। এই তালিকায় দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা ধাঁচের হোটেলগুলো অন্তর্ভুক্ত।

মূল ভবনটি ২০১৮ সালে জাপান সরকার কর্তৃক জাতীয় ‘ট্যাঞ্জিবল কালচারাল অ্যাসেট’ বা গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে হোটেলটিতে জন লেননের স্মৃতিতে একটি ছোট জাদুঘরও রয়েছে, যেখানে তার ব্যবহৃত পিয়ানো সংরক্ষিত আছে।

১৯৮০ সালে লেননের মৃত্যুর পরও তার স্মৃতি এবং বিশ্বশান্তির বার্তা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। আর জাপানের এই হোটেলটি, যা তার নিজ দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, আজও দ্য বিটলস-এর বৈশ্বিক প্রভাব এবং জন লেননের উত্তরাধিকারের এক নীরব স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।