প্রধানমন্ত্রীর সফরে আলোচনায় ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, কী আছে দেশের প্রথম এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে
কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শনে ১৩ জুন যাওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তাঁর এই সফরকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের প্রথম সাফারি পার্কটি। সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত কক্সবাজারের অন্যতম আকর্ষণ এই পার্ক শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, গবেষণা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও।
চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারায় অবস্থিত পার্কটি চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১০৭ কিলোমিটার এবং কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দূরে। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে ৪২ দশমিক ৫ হেক্টর বনভূমিতে হরিণ প্রজননকেন্দ্র হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। পরে দেশের প্রথম সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে পর্যায়ক্রমে এর আয়তন বাড়িয়ে ৯০০ হেক্টরে উন্নীত করা হয়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় পার্কটির জন্য ১০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা অনুমোদন পায়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৯ সাল থেকে উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, ১৩ জুন দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পার্কটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। সফর উপলক্ষে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
হাজারো প্রাণীর আবাস
বর্তমানে ডুলাহাজারা দেশের অন্যতম বৃহৎ বন্যপ্রাণী সংগ্রহশালা। পার্কের বিভিন্ন বেষ্টনীতে ৫২ প্রজাতির ৩৪১টি প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে সিংহ, বাঘ, জেব্রা, ওয়াইল্ডবিস্ট, জলহস্তী, কুমির, অজগর, হাতি, ভালুক, ময়ূর এবং বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করছে ১২৩ প্রজাতির প্রায় এক হাজার প্রাণী। গুইসাপ, শজারু, বনরুই, মার্বেল ক্যাট ও বাগডাশসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী এখানে দেখা যায়।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনজুরুল আলম জানান, পার্কটিতে বর্তমানে সাতটি বাঘ, ছয়টি সিংহ, ২৪টি ভালুক এবং পাঁচটি হাতি রয়েছে। অধিকাংশ প্রাণীর জন্য বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত আবাসস্থল থাকায় দর্শনার্থীরা তাদের স্বাভাবিক আচরণ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান।
পার্কটির সবচেয়ে জনপ্রিয় আকর্ষণ প্রাণী সাফারি জোন। বিশেষ যানবাহনে নিরাপদ দূরত্ব থেকে বাঘ, সিংহ, ভালুক ও তৃণভোজী প্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। শিশুদের কাছে জলহস্তী, কুমির, ময়ূর, বানর ও হরিণ বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।
শুধু প্রাণী নয়, উদ্ভিদবৈচিত্র্যেরও ভান্ডার
ডুলাহাজারা শুধু বন্যপ্রাণীর জন্যই পরিচিত নয়। গবেষকদের মতে, এটি দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ উদ্ভিদভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র। ৯০০ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই পার্কে রয়েছে শত শত প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ, ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম ও অর্কিড।
২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, পার্কটিতে প্রাকৃতিকভাবে বন পুনর্জন্মের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সেখানে ৫৬ প্রজাতির বৃক্ষের ৮৩৫টি চারা শনাক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের বনজ জীববৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, ডুলাহাজারা প্রাণী ও উদ্ভিদ উভয়ের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অভয়ারণ্য। এখানে এখনো বহু দেশীয় বৃক্ষ প্রজাতি টিকে রয়েছে এবং বন পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা অত্যন্ত ইতিবাচক।
পর্যটনের পাশাপাশি সংরক্ষণের কেন্দ্র
প্রতিবছর লাখো দর্শনার্থী ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে ভ্রমণ করেন। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ এখানে আসেন। কক্সবাজার ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের বড় অংশ সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি এই সাফারি পার্কও ঘুরে দেখেন।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি সংরক্ষণসংক্রান্ত কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়ন, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণ, পর্যটন সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আধুনিক সাফারি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কাজ চলছে। গবেষকেরা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যবস্থাপনা আরও জোরদারের সুপারিশ করেছেন।