দিগন্তে ঝড়ের পূর্বাভাস। মেঘের আড়ালে বিদ্যুতের চমকানি আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ জানান দিচ্ছে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চের। ঠিক এই মুহূর্তে আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ার ছোট্ট এবং স্বল্পপরিচিত কাসানকা ন্যাশনাল পার্কে ঘুম ভাঙছে কোটি কোটি বাদুড়ের।

প্রতি বছর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের এই সময়ে কাসানকা পার্কের আকাশে নেমে আসে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিযায়ী দল, যা খুব কম পর্যটকের ভাগ্যেই জোটে।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বৃহত্তম মহাপ্রয়াণ

কাসানকার এই বাদুড় পরিযান মূলত 'স্ট্র-কালারড ফ্রুট ব্যাট' বা খড়-রঙা ফলভোজী বাদুড়ের। সেন্ট্রাল আফ্রিকা বা মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফলের মৌসুমি প্রাচুর্যের টানে আনুমানিক ৮০ থেকে ১০০ লাখ বাদুড় এই পার্কে এসে জড়ো হয়। সংখ্যাটা আফ্রিকার বিখ্যাত সেরেঙ্গেটি বন্যপ্রাণী পরিযানের চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি! প্রতি বছর সেরেঙ্গেটির পরিযান দেখতে যেখানে ৫ থেকে ৭ লাখ পর্যটক ভিড় করেন, সেখানে কাসানকার এই জাদুকরী দৃশ্য দেখার সুযোগ পান মাত্র ৮০০ জনের মতো ভ্রমণপিপাসু।

প্রকৃতির এক জীবন্ত ঝড়

কাসানকা ন্যাশনাল পার্কের আয়তন ৩৯০ বর্গকিলোমিটার, যা জাম্বিয়ার অন্যতম ক্ষুদ্রতম পার্ক। এখানে সেরেঙ্গেটির মতো বিশাল সমভূমি বা সিংহের বড় বড় দল নেই, নেই সাফারি গাড়ির কোলাহল। এর বদলে আছে বিস্তীর্ণ জলাভূমি, লেগুন, প্যাপাইরাস বন আর শান্ত পরিবেশ।

বিকেলের সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন বনের ভেতরের দৃশ্য বদলে যেতে শুরু করে। গাছের ডালে ডালে হাজার হাজার বাদুড় এত ঠাসাঠাসি করে ঝুলে থাকে যে, মনে হয় ডালগুলো ওজনের চোটে ভেঙে পড়বে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে কোটি কোটি ডানার ঝাপটানি আর কিচিরমিচির শব্দে আকাশ কেঁপে ওঠে। ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুড় যখন চারদিকে উড়তে শুরু করে, তখন দূর থেকে মনে হয় যেন বনের ভেতর থেকে বিশাল কালো ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে আকাশে উঠছে। এই দৃশ্য দেখতে পাওয়া মানে প্রকৃতির এক জীবন্ত ঝড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা।

অবিশ্বাস্য খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশগত অবদান

এই ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা এক রাতেই প্রায় ৯৬ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। এদের এক একটির ওজন মাত্র ২৫০ গ্রাম হলেও, এরা প্রতি রাতে নিজেদের ওজনের সমান ফল সাবাড় করতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, কাসানকায় থাকাকালীন এই বাদুড়ের দল প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টন বুনো ফল (যেমন বুনো লোকাত, মিল্কউড ও ওয়াটারবেরি) খেয়ে থাকে। শুধু এক রাতেই এরা সাবাড় করে ২৩০ থেকে ২৫০ টন ফল!

খাবার গ্রহণের পাশাপাশি এরা মলত্যাগের মাধ্যমে বিশাল এলাকাজুড়ে বীজ ছড়িয়ে দেয়। পরিবেশবিদদের মতে, হাতি বা অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীদের চেয়েও অনেক দূরবর্তী এলাকায় বীজ ছড়িয়ে দিয়ে নতুন বনায়নে এই বাদুড়রা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০৫ সালের একটি স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু বাদুড় প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে। তবে এরা ঠিক কোথা থেকে আসে এবং জানুয়ারি মাসে এখান থেকে কোথায় হারিয়ে যায়, তা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য।

কাসানকার অন্যান্য বিস্ময়

১৯৮০-এর দশকে শিকারিদের দাপটে এই পার্কটি প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। ১৯৯০ সালে ডেভিড লয়েড নামের এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা নিজস্ব অর্থায়নে এর পুনরুজ্জীবন ঘটান। বর্তমানে বাদুড়ের পাশাপাশি কাসানকা আরেকটি বিরল প্রাণীর জন্য বিখ্যাত, তা হলো 'সিতাতুঙ্গা', যা আফ্রিকার একমাত্র উভচর হরিণ। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে প্যাপাইরাস বনের ভেতর থেকে এদের জলকেলি করতে দেখা এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। এছাড়া পার্কটিতে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে, যা একে পাখিদের এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে।

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বাদুড়গুলো যখন আবার উল্টো প্রক্রিয়ায় চিৎকার করতে করতে গাছে ফিরে আসে, তখন মনে হয় যেন পুরো আকাশ আবার শান্ত হয়ে ঘুমাতে চলেছে। কাসানকা হয়তো ক্রুগার বা সেরেঙ্গেটির মতো বিশ্বখ্যাত নয়, এখানে কোনো বিলাসবহুল লজ বা আধুনিক কোলাহল নেই। কিন্তু গোধূলিলগ্নে কোটি কোটি ডানার ছায়ায় যখন আফ্রিকার আস্ত আকাশটাই ঢাকা পড়ে যায়, সেই আদিম ও অকৃত্রিম বিস্ময়ের কোনো তুলনা হয় না।