বিলম্বিত ফ্লাইট, বিমানবন্দরের ভিড়, অপরিচিত পরিবেশ কিংবা ভাষাগত জটিলতা—ভ্রমণের আনন্দ অনেক সময় উদ্বেগে ম্লান হয়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ কৌশল অনুসরণ করলে ভ্রমণজনিত দুশ্চিন্তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
গত দুই দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করা লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক টম সাইকস নিজেও এ ধরনের উদ্বেগে ভোগেন। 
ভ্রমণ-উদ্বেগ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি মনোবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের নানা মতামত বিশ্লেষণ করেছেন। তার নতুন বই ‘দ্য ইয়ার্স অব ট্রাভেলিং অ্যানজিয়াসলিতে’এসব অভিজ্ঞতা ও সমাধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেই বই ও একাধিক বিশেষজ্ঞের বরাতে মোটা দাগে পাঁচটি পরামর্শ তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।

১. শহুরে পরিবেশে মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিন
মনোবিজ্ঞানী কলিন এলার্ড তার ‘প্লেইস অব হার্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, আধুনিক শহরের ঘন যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যস্ত নগর পরিবেশে চলাফেরার সময় মানুষের অ্যাড্রেনালিন, রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তাই নতুন কোনো শহরে পৌঁছালে পার্ক, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা, প্রাকৃতিক আলোযুক্ত স্থান এবং আরামদায়ক পরিবেশ খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

২. ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আগে থেকেই জানুন
অপরিচিত সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক ভ্রমণকারীর জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভিন্ন সংস্কৃতির সামাজিক নিয়ম-কানুন না জানার কারণে অনিচ্ছাকৃত ভুল বোঝাবুঝি বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গন্তব্য দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা নেওয়া এসব সমস্যার ঝুঁকি কমায়। এতে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয় এবং আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।

৩. উদ্বেগকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিন
ডেনিশ দার্শনিক সোরেন কিয়ার্কেগার্ড মনে করতেন, উদ্বেগ মানুষের স্বাধীনতা ও আত্ম-উপলব্ধির একটি স্বাভাবিক উপাদান। তার মতে, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলো প্রায়ই অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়েই আসে।
ভ্রমণও তার ব্যতিক্রম নয়। যদি ভ্রমণে কোনো চ্যালেঞ্জ, সমস্যা বা অজানা পরিস্থিতি না থাকে, তাহলে নতুন কিছু শেখার সুযোগও কমে যায়। তাই সামান্য উদ্বেগকে ভয় না পেয়ে অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

৪. পরিবেশগত উদ্বেগ মোকাবিলা করুন
বর্তমানে অনেক ভ্রমণকারী জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত পর্যটনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিমান ভ্রমণ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের একটি উল্লেখযোগ্য উৎস, আর জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় অতিরিক্ত ভিড় পরিবেশের ক্ষতি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র বেছে নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ কমানো এবং নিজের কার্বন পদচিহ্ন হ্রাসের চেষ্টা করলে এই ধরনের অপরাধবোধ ও উদ্বেগ কমতে পারে।

৫. জ্ঞান অর্জন করুন, উদ্বেগ নয়
নাট্যকার অ্যালান বেনেটের মতে, মানুষ তখনই স্বস্তি অনুভব করে যখন বুঝতে পারে তার অনুভূতিগুলো একান্ত ব্যক্তিগত নয়; অন্যরাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
ভ্রমণ-উদ্বেগ নিয়ে দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের লেখা বই পড়লে অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে বুঝতে পারেন। এতে উদ্বেগের কারণগুলো স্পষ্ট হয় এবং তা মোকাবিলার মানসিক শক্তিও বৃদ্ধি পায়।