নদী, সাগর, চরাঞ্চল ও সুন্দরবনের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে বরগুনা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাবে এ সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বরগুনার সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট।

বিষখালী, বলেশ্বর, বুড়িশ্বর ও আন্ধারমানিক নদীর মোহনা ঘিরে গড়ে ওঠা বরগুনার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। সুন্দরবনের সুপতি, কটকা, শরণখোলা, হিরণ পয়েন্ট ও দুবলারচরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলেও পাথরঘাটা উপজেলা থেকে তুলনামূলক সহজে যাতায়াত করা যায়।

এ ছাড়া তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইকো পার্ক, টেংড়াগিরি বন, শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকত, নিদ্রারচর ও আশারচর পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উপকূলীয় এই অঞ্চলে রয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির উপস্থিতিও।

এমন সম্ভাবনাময় পরিবেশে ব্যক্তি উদ্যোগে সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন লেখক, সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা সোহেল হাফিজ। বরগুনা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এ প্রকল্পটি সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের বড়ইতলা ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকায়, শহর থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গোলপাতা, নলখাগড়া, হোগলা ও কাশবন দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো রিসোর্ট এলাকা। এখানে কাঠবাদাম, কদম, ডেউয়াসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। রয়েছে শাপলা-পদ্মে ভরা ‘নীল পদ্মের শিমুল পুকুর’ এবং বকুলগাছে ঘেরা ‘বকুল পুকুর’।

পাখির আবাস ও খাদ্য নিশ্চিত করতে সহস্রাধিক দেশীয় ফলদ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। বাবুই পাখি ফিরিয়ে আনতে লাগানো হয়েছে শতাধিক তাল ও খেজুরগাছ। পাশাপাশি পাখিদের খাদ্যের জন্য রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির কলা ও পেঁপের বাগান।

সরকারি উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয়েছে ফলদ বৃক্ষের বাগান। জেলা মৎস্য বিভাগের সহায়তায় পুকুরগুলোতে মাছের পাশাপাশি মুক্তা চাষও করা হচ্ছে। প্রজাপতি ও জোনাকির জন্য তৈরি করা হয়েছে উপযোগী পরিবেশ।

রিসোর্টে পিকনিক, শিক্ষাসফর, কর্মশালা ও সেমিনারের জন্য রয়েছে খোলা মাঠ, নান্দনিক মঞ্চ, আধুনিক মিলনায়তন এবং আবাসিক সুবিধা। দর্শনার্থীদের জন্য ১১টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও সাধারণ কটেজ রয়েছে। দলীয় ভ্রমণের জন্য রয়েছে স্বল্প খরচের ডরমেটরি সুবিধাও।

সুরঞ্জনা ইকো ট্যুরিজম অ্যান্ড রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল হাফিজ বলেন, বরগুনায় বিনোদন ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের সুযোগ সীমিত ছিল। সেই অভাব পূরণের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসছেন।

পর্যটক আবদুল্লাহ আল নাইম বলেন, পাখির কলতান, গাছপালার সবুজ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। অন্য পর্যটক সালেহ মাহমুদ সুমনের মতে, প্রকৃতির নির্মল রূপ উপভোগের জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান।

বরগুনার পর্যটন উদ্যোক্তা ও পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, নদী, সাগর, চর ও সবুজ প্রকৃতির সমন্বয়ে বরগুনা একটি অনন্য পর্যটন অঞ্চল। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে জেলাটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ আজিজ বলেন, সুরঞ্জনা একটি সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র। পাশাপাশি গোড়াপদ্মাসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় এলাকাকেও পর্যটন স্পট হিসেবে উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।