দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পারমাণবিক হামলার স্মৃতি বয়ে চলা জাপানের নাগাসাকি আজ বিশ্বের অন্যতম আলোচিত পর্যটন গন্তব্য। প্রায় আট দশক আগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরটি পুনর্গঠন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে এখন আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। চলতি বছর মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের নির্বাচিত ৫২টি বৈশ্বিক পর্যটন গন্তব্যের তালিকায় নাগাসাকির অবস্থান ১৭তম। একই সঙ্গে পাঠক জরিপে শহরটি উঠে এসেছে শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যের মধ্যে।
টোকিওতে বিদেশি সাংবাদিকদের ক্লাব এফসিসিজেতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নাগাসাকির মেয়র সুজুকি শিরো শহরটির পুনর্জাগরণের গল্প তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট পারমাণবিক বোমা হামলায় প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। তবে মেঘলা আবহাওয়া ও শহরের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে বোমাটি নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বিস্ফোরিত হওয়ায় পুরো শহর ধ্বংস হয়নি। ফলে কেন্দ্রীয় অংশসহ অনেক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা টিকে যায়।
হামলার পরও নাগাসাকির মানুষ জীবন থামিয়ে রাখেননি। একই বছরের অক্টোবরেই অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নাগাসাকি কুনচি উৎসব। ধ্বংসপ্রাপ্ত উরাকামি ক্যাথেড্রালের একটি ঘণ্টা উদ্ধার করে ক্রিসমাসে বাজানো হলে তা শহরবাসীর জন্য নতুন আশার প্রতীক হয়ে ওঠে।
বর্তমানে নাগাসাকির অন্যতম আকর্ষণ শান্তি স্মারক ভাস্কর্য, উরাকামি ক্যাথেড্রাল এবং পারমাণবিক বোমা স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থাপনা। এসব স্থান শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, শান্তির বার্তাও বহন করে।
তবে নাগাসাকির জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু ইতিহাস নয়, রয়েছে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও। সমুদ্র, বন্দর, পাহাড় ও ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা বসতি শহরটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য। এই বৈশিষ্ট্যই নিউইয়র্ক টাইমসের তালিকায় শহরটির স্থান পাওয়ার অন্যতম কারণ।
নাগাসাকির গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে ইউনেসকো স্বীকৃত হাশিমা দ্বীপ, যা ‘গুনকানজিমা’ বা যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ নামেও পরিচিত। একসময় জাপানের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ কয়লাখনি দ্বীপ এখন জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। সীমিত পরিসরে এখানে গাইডেড ভ্রমণের ব্যবস্থা রয়েছে।
নাগাসাকির আরেকটি বিশেষ পরিচয় এর বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। জাপানের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার যুগে বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র ছিল এই শহর। জাপানি, চীনা ও পশ্চিমা সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা ‘ওয়াকারান’ সংস্কৃতি আজও নাগাসাকির পরিচয়ের অংশ।
এই সাংস্কৃতিক বিনিময়ের বড় কেন্দ্র ছিল দেজিমা দ্বীপ। এখান থেকেই জাপানে পশ্চিমা জ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও খাদ্যসংস্কৃতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। কাস্টেলা, চ্যাম্পনসহ বহু জনপ্রিয় খাবারের শিকড়ও নাগাসাকিতে। সম্প্রতি স্থানীয় রন্ধনশৈলীতে যুক্ত হয়েছে ‘শাসি-সাবু’, যা সাশিমি ও সাবু-সাবুর সংমিশ্রণে তৈরি।
মেয়র সুজুকির মতে, ইতিহাস, প্রকৃতি, খাদ্যসংস্কৃতি ও শান্তির বার্তা একসঙ্গে ধারণ করায় নাগাসাকি অন্য যেকোনো গন্তব্য থেকে আলাদা। পর্যটন বাড়াতে ইউরোপ ও আমেরিকার দর্শনার্থীদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও বিশ্বের সব অঞ্চলের পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত শহরটি।