গাজীপুরের শ্রীপুরে দেশের অন্যতম বড় সাফারি পার্কটি এখন আর আগের মতো আকর্ষণ ধরে রাখতে পারছে না। একের পর এক সেবা বন্ধ, অবকাঠামোর বেহাল দশা, প্রাণী ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন এবং নিরাপত্তা ঘাটতি মিলিয়ে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে হতাশাজনক। ফলে একসময় ভিড়ে উপচে পড়া পার্কে এখন দর্শনার্থী কমছে, বাড়ছে অসন্তোষ।
গত ২৮ মার্চ সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কে ঘুরতে এসে অনেকেই বিরক্তি নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এক দর্শনার্থী পরিবারসহ ঘুরতে এসে বলেন, “এখানে এসে কী দেখলাম, সেটাই বুঝতে পারছি না।” প্রচণ্ড গরম, অচল সেবা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাদের অভিজ্ঞতাকে আরও খারাপ করেছে।
বন্ধ সেবা, কমছে আকর্ষণ
পার্কের ভেতরে বাঘ ও সিংহ দেখার পাশাপাশি খাবারের জন্য যে দুটি রেস্তোরাঁ রয়েছে, সেগুলো বন্ধ। প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, প্যাডেল বোট, এগ ওয়ার্ল্ড, হাতি শো গ্যালারি, শিশুপার্ক—প্রায় সব বিনোদন সুবিধাই অচল। নেই কোনো স্যুভেনির শপ বা পর্যটক গাইড।
প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। একটি হুইলচেয়ার ছাড়া বিশেষ কোনো সুবিধা দেখা যায়নি।
৩ হাজার ৬৯০ একর জায়গাজুড়ে ভাওয়াল শালবনে গড়ে ওঠা এই পার্ক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পার্কের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং কিছু স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
টিকিটে টিকিটে বিরক্তি
পার্কে প্রবেশের পর প্রায় প্রতিটি আকর্ষণের জন্য আলাদা টিকিট কিনতে হয়। এতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীর পুরো পার্ক ঘুরতে খরচ পড়ে অন্তত ৫৫০ টাকা। পরিবার নিয়ে গেলে এই ব্যয় কয়েক হাজার টাকায় পৌঁছায়।
শ্রীপুরের ব্যবসায়ী এস এম হাবিব সরকার বলেন, “একবার টিকিট কাটার পর আবার প্রতিটি জায়গায় আলাদা টিকিট দিতে হচ্ছে। পরিবেশও নোংরা, কোর সাফারির রাস্তা খারাপ।”
দর্শনার্থী কমছে, প্রাণীর সংখ্যাও হ্রাস
একসময় উৎসবের দিনে ৫০ হাজার দর্শনার্থীর ভিড় থাকলেও এখন দৈনিক গড় দর্শনার্থী নেমে এসেছে ১ থেকে দেড় হাজারে। প্রাণীর সংখ্যাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
২০১৬ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদনে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩টি প্রাণীর উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা কমে প্রায় এক হাজারে দাঁড়িয়েছে। অনেক প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে পার্ক থেকে। যেমন, আনা ২৫টি জেব্রার একটিও এখন জীবিত নেই, ১২টি জিরাফের সবকটিই মারা গেছে।
প্রাণী মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন
প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বারবার আলোচনা হয়েছে। পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রাণীর অনুপযুক্ত অনুপাত, পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্য, অপর্যাপ্ত চিকিৎসা, দূষিত পানি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা এসব মৃত্যুর কারণ।
২০২২ সালে একাধিক প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনায় হাইকোর্টে রিটও হয়েছিল। তদন্ত কমিটি গঠনসহ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি
পার্কে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। কোনো পুলিশ ক্যাম্প নেই, সিসি ক্যামেরা সীমিত। সীমানাপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশ ভাঙা বা দুর্বল, ফলে অনুপ্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে।
এরই মধ্যে প্রাণী চুরি ও পালানোর ঘটনাও ঘটেছে। যেমন, রিংটেইল লেমুর চুরি, ম্যাকাও পাখি চুরি এবং নীলগাই পালানোর ঘটনা।
হাসপাতাল ও ল্যাব কার্যত অচল
পার্কে বন্য প্রাণী হাসপাতাল থাকলেও সেটির অবস্থা খারাপ। ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ায় অস্ত্রোপচারকক্ষ অকার্যকর হয়ে গেছে। ল্যাবরেটরিও প্রায় বন্ধের পথে।
ভেটেরিনারি কর্মকর্তা জানান, আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবল সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না।
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ঝুঁকিতে প্রাণী
দর্শনার্থীরা পলিথিনে খাবার নিয়ে এসে প্রাণীদের খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। এতে প্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পার্কজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনাও পরিবেশকে নষ্ট করছে।
কুমিরসহ বিভিন্ন প্রাণীর বেষ্টনীও নড়বড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দর্শনার্থীরা খুব কাছাকাছি চলে যেতে পারছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পরিকল্পনা কাগজে, বাস্তবায়ন সীমিত
২০১০ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন। ২০১৯ সালে নেওয়া মহাপরিকল্পনায় আধুনিক অবকাঠামো, রিভার সাফারি, নাইট সাফারি, উন্নত হাসপাতালসহ নানা উদ্যোগের কথা থাকলেও অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।
বর্তমানে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প চললেও প্রয়োজনীয় বাজেট ও জনবলের অভাব বড় বাধা হয়ে আছে।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
সহকারী বন সংরক্ষক মো. তারেক রহমান বলেন, “সীমানাপ্রাচীর, নিরাপত্তা, জনবল ও বাজেট—সবখানেই ঘাটতি আছে। এগুলোই পার্ক পরিচালনার বড় চ্যালেঞ্জ।”
প্রথম প্রকল্প পরিচালক তপন কুমার দে মনে করেন, “পার্কের অনেক কিছুই এখন আর নেই। এটি রক্ষায় সরকারের নজর বাড়ানো জরুরি।”