বর্তমান যুগের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক কর্মজীবন আর স্মার্টফোনের নোটিফিকেশনের শব্দে মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। অফিস শেষ হলেও ল্যাপটপ বা ফোনের মাধ্যমে কাজের চাপ পিছু ছাড়ে না। এই ‘ডিজিটাল বার্নআউট’ থেকে বাঁচতে বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের মধ্যে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এক নতুন ধারা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডেডজোনিং’।

‘ডেডজোনিং’ কী?
সহজ কথায়, ‘ডেডজোনিং’ হলো ভ্রমণে গিয়ে ডিজিটাল জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের পর্যটকরা এখন এমন সব গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন, যেখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই বা ইন্টারনেট সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল। উদ্দেশ্য একটাই— সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার ক্লান্তি মুছে ফেলে প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়া।

গবেষণায় যা দেখা যাচ্ছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কর্মক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদী চাপ মানুষের মধ্যে চরম অবসাদ বা ‘বার্নআউট’ তৈরি করছে। মেন্টাল হেলথ ইউকের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই গত এক বছরে তীব্র মানসিক চাপের শিকার হয়েছেন। 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ছুটি নিলেই এই চাপ কমে না, যদি না সেই ছুটির সময় মানুষ কর্মক্ষেত্রের ইমেইল বা কল থেকে দূরে থাকে।

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের অভিমত
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন বিশেষজ্ঞ ড. বার্গিট ট্রাওয়ার বলেন, “মানুষ এখন কেবল ঘোরার জন্য ঘুরতে যাচ্ছে না, তারা মূলত যান্ত্রিক জীবন থেকে পালাতে চাইছে। আমরা সারাক্ষণ অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে থাকি। ‘ডেডজোনিং’ আমাদের সেই সক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়, যাতে আমরা বর্তমান মুহূর্তে বাঁচতে পারি এবং নিজের সাথে কথা বলতে পারি।”

আধুনিক মোড়কে পুরনো অভ্যাস
যদিও ‘ডেডজোনিং’ শব্দটি নতুন, কিন্তু ধারণাটি পুরনো। ১৯৫০ থেকে ৭০-এর দশকে ‘হিপি ট্রেইলের’ সময় ভ্রমণকারীরা মাসের পর মাস পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগহীন থেকে বিশ্বভ্রমণ করতেন। বর্তমান প্রজন্মের পর্যটকরা সেই পুরনো স্বাদটিই নতুন করে ফিরে পেতে চাইছেন। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফোন বন্ধ রাখছেন কিংবা ‘আউট অব অফিস’ অটো-রিপ্লাই সেট করে নিরুদ্দেশ হচ্ছেন।

সুফল ও ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, ডিজিটাল সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে মানুষের ‘কগনিটিভ লোড’ বা মস্তিষ্কের চাপ কমে। এটি উদ্বেগ কমায়, ঘুমের মান উন্নত করে এবং মেজাজ ফুরফুরে রাখে। তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। 
ড. ট্রাওয়ার সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় শান্ত পরিবেশে কাটানোর পর হঠাৎ করে আবার শহরের কোলাহলে ফিরলে অনেক সময় ‘রিভার্স কালচার শক’ হতে পারে। এতে অনেকে আবার কাজে ফেরার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।


গন্তব্য যেখানে স্বস্তি
ইউরোপের গ্রিস, রোমানিয়া বা ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে এখন এমন সব ‘অফ-গ্রিড’ রিসোর্ট জনপ্রিয় হচ্ছে যেখানে নেটওয়ার্ক পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বান্দরবানের দুর্গম পাহাড় বা সুন্দরবনের গহীন অরণ্য ‘ডেডজোনিং’ -এর জন্য পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসছে।